ঊনবিংশ শতকে কলকাতার বিকাশ | Kolkata as a metropolis city in British rules - itihas Pathshala



Explain the origin and growth of kolkata as a city (Metropolis).

Or

What was the role of Indigenous population in the growing city of kolkata.

Or

How far was the origin of kolkata as an out come of external forces (business group) what do you mean by 'dual character' in the development of kolkata?

নগর হিসাবে কলকাতার উৎপত্তি ব্যাখ্যা কর।


অথবা 

কলকাতার নাগরিক বিকাশে জনসমাজের কি ভূমিকা ছিল ?


 অথবা

ঊনবিংশ শতকে কলকাতার বিকাশ কতদূর বাজারী শক্তি গুলির ফলশ্রুতি ছিল? কলকাতার বিকাশের দ্বৈত চরিত্র বলতে কি বোঝ ?



১৬৯০ খ্রীঃ মুঘল সম্রাটের আদেশ বলে জব চার্নক সুতানুটীতে কোম্পানীর বানিজ্য কুঠী স্থাপন করেন। ১৬৯৮ খ্রীঃ কোম্পানীকে কলিকাতা, সুতানুটী ও গোবিন্দপুর গ্রামের জমিদারী স্বত্ব দেওয়া হয়। একে কেন্দ্র করেই নগর কলকাতার বিকাশ ঘটতে থাকে। এই কলকাতা নগরী গড়ে ওঠার পিছনে দুটি দিক ছিল।

  • (১) অবয়ব সংক্রান্ত দিক 
  • (২) জনসংখ্যাগত দিক 


বিভিন্ন প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে একটি নগরী গড়ে ওঠে। কলকাতার ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। প্রদীপ সিনহা ও নিশীথ রঞ্জন রায়ের মতে কলকাতা নগরীর বিকাশ ঘটে বাজার নগরী হিসাবে। বস্তুত কোম্পানি ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবকে অক্ষত রাখার জন্য ভারতবর্ষে একটি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা করে। উদ্দেশ্য ছিল দুটি 
  • (১) ভারতবর্ষ থেকে শিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ 
  • (২) বৃটিশ শিল্পজাত পন্যকে ভারতের বাজারে নিরাপদে বিক্রি করা। এই জন্যই তারা ভারতের দুর্বলতম অংশ পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগর এবং হুগলী নদীর উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে।


ঊনবিংশ শতকে কলকাতা মূলত চারটি অংশে বিভক্ত ছিল 
  • (১) ডিহি কলকাতা 
  • (২) গোবিন্দপুর 
  • (৩) বাজার কলকাতা (বড়বাজার) 
  • (৪) সুতানুটি। 
প্রদীপ সিনহার মতে ঔপনিবেশিক কলকাতার দ্বৈত সত্ত্বা লক্ষ্য করা যায়। (ক) কৃষ্ণাঙ্গ (খ) শ্বেতাঙ্গ। উত্তর ও মধ্য কলকাতার মাঝামাঝি অঞ্চলে ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের বাস। প্রধানত হ্যারিসন রোড, মহাত্মা গান্ধী রোড, বড়বাজার, কলেজ স্ট্রীট, উঃ মানিকতলা, শ্যামবাজার প্রভৃতি। শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলছিল মধ্য কলকাতা থেকে দক্ষিন কলকাতার উপকণ্ঠ অর্থাৎ ধর্মতলা, পার্ক স্ট্রীট, থিয়েটার রোড প্রভৃতি।


কৃষ্ণাঙ্গদের পরিবেশ ছিল নোংরা, ময়লা ও অস্বাস্থ্যকর। বাড়িগুলি ছিল ঘিঞ্জি অর্থাৎ ফাঁকা জমির অভাব লক্ষ্য করা যায়। পাকাবাড়ি ছিল হাতে গোনা। প্রচুর পরিমাণে কুঁড়ে ঘর দেখতে পাওয়া যায় যে গুলি সাধারণত খড় ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে টালি দিয়ে নির্মিত হত। পাকা অট্টালিকা গুলিতে থাকতেন কলকাতার ব্যবসায়ী, মুৎসুদ্দি, স্রফ (যারা টাকা ধার দিত), বাবু সম্প্রদায় যাদের আয়ের উৎস ছিল জমিদারি অথবা ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা। এদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ভালো ছিল না।


কৃষ্ণাঙ্গ অঞ্চলে আশেপাশের জেলা, প্রদেশ ও গ্রাম থেকে শ্রমজীবি মানুষরা আসত। পালকির বেয়ারার কাজ, বাড়ি বাড়ি জল দেবার কাজ করত মূলতঃ উড়িষ্যার লোকেরা। কোচম্যানের কাজ করত বিহারী মুসলিমরা। এই কৃষ্ণাঙ্গ অঞ্চলের মানুষেরা তাদের ফেলে আসা গ্রাম্য জীবনের নানা বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে চাইত। এর জন্য এরা চণ্ডিমণ্ডপ গড়ত এবং দক্ষিন দুয়ারি বাড়ি তৈরী করত ও বাড়ির দাওয়াতে তুলসী মঞ্চ স্থাপন করত। এক একটা পেশাকে কেন্দ্র করে এক একটি পাড়া গড়ে উঠত। যেমন- দর্জিপাড়া, তাঁতীপাড়া, মুচিপাড়া প্রভৃতি। আবার গাছের নামেও পাড়ার নাম হত যেমন- বটতলা, শিমুলতলা প্রভৃতি। ঠাকুর দেবতার নাম অনুসারেও পাড়ার নাম হত যেমন - ষষ্ঠীতলা, মনসাতলা প্রভৃতি। তবে রাস্তার কোন নির্দিষ্ট নাম দেওয়ার রীতি তখনও পর্যন্ত প্রচলিত হয়নি। 


শেতাঙ্গ অধুষিত অঞ্চলে বাস করত মূলত ইউরোপীয়রা যারা অধিকাংশই ছিল ইংরেজ। এদের বসবাসের এলাকা ছিল পরিচয়া, প্রশস্ত রাস্তাঘাট, সমস্ত কিছুই ছিল অনেক বেশী পরিকল্পিত। এখানকার অধিবাসীরা ছিল বেশ মার্জিত। এখানকার বাড়ি গুলি ছিল মূলত ভিকটোরিয় শৈলীর। প্রত্যেক বাড়ির চারিদিকে বাগান করার মত ফাঁকা জায়গা ছিল। একটি বাড়ি থেকে অপর বাড়ির দূরত্ব অনেকটাই ছিল। এখানকার বাসিন্দাদের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল যে, এখানে কোন কৃষ্ণাঙ্গ ঢুকতে পারবে না। তবে ভৃত্য স্থানীয় দেশীয় মানুষদের যেমন - ম্যাথর, নাপিত, পাল্কিবাহক, পাচক প্রভৃতিদের শ্বেতাঙ্গ অঞ্চলে ঢুকতে দেওয়া হত।


১৭৯৩ খ্রীঃ আপ জনের মানচিত্র এবং ১৮২৫ খ্রীঃ স্ক্যাপচ এর নকশা কলকাতার নগরায়নের ইতিহাসের দুটি উল্লেখযোগ্য উৎস। এর থেকে জানা যায় উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় কলকাতায় বেশ কিছু পুকুর কাটা হয়েছিল বড় বড় বাড়ি নির্মানের জন্য। কলকাতার অভিলেখাগার থকে প্রকাশিত গ্রন্থে কলকাতার জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে- কলকাতায় দিনের জনসংখ্যা থেকে রাতের জনসংখ্যা কম ছিল। কারণ রাত্রিতে সবাই জীবিকা অর্জনের পর বাড়ি ফিরে যেত, বাসস্থান সীমিত ছিল বলে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বেনিয়া শ্রেণী স্বাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করল এবং বাসস্থানের জন্য দালালিও করতে শুরু করল। এই প্রক্রিয়ার ফলে কলকাতার বাজার এলাকায় ধীরে ধীরে বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে ও পরে তার সম্প্রসারণ ঘটে কলকাতার অন্যত্র। এর ফলে কলকাতার ধনী পরিবার গুলির মধ্যে একটা প্রতিযোগীতার সৃষ্টি হয় এবং কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রামসমাজ গড়ে ওঠে। স্থানীয় বসতি এলাকাগুলি বাজার এলাকায় গড়ে ওঠে। যেমন শ্যামবাজার, বাধ্যবাজার, মেছুয়াবাজার প্রভৃতি। বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠার ফলে এই বসতিগুলিতে একটি মিশ্র জনপদ গড়ে উঠেছিল। নানা ধর্ম, বর্ণ জাতের মানুষ এখানে বসবাস করত। একেবারে নীচুতলার খেটে খাওয়া মানুষদের লক্ষ্য ছিল ধনী-পরিবার গুলির চাহিদার যোগান দেওয়া। তাই তারা ধনীদের আশেপাশে বাস করতে শুরু করে।


কলকাতার নগরায়নে লটারী কমিটির ভূমিকা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কমিটির উদ্দেশ্য ছিল। দু'পাশে পয়ঃ প্রণালী সহ পাকা সড়ক নির্মান করে ধারে ধারে বসত এলাকা গড়ে তোলা। লটারী কমিটির উদ্যোগে যে সমস্ত সড়ক পথ নির্মিত হয়েছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল শহরের উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত প্রসারিত রাজপথটি (কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, ওয়েলিংটন স্ট্রীট, ওয়েলেসলী স্ট্রীট)। অন্যদিকে কমিটি কেবল মাত্র শ্বেতাঙ্গ। অধ্যুষিত এলাকা যথা পার্ক স্ট্রীট ও পার্ক সার্কাসকে উন্নত করতে চেয়েছিল। এর ফলে কালো চামড়ার এলাকা অবহেলিতই থেকে যায়। এবং কালো চামড়া ও সাদা চামড়ার মধ্যে পার্থক্য বাড়তেই থাকে। এই কমিটির ঔচিত্য ও অর্থসংগ্রহের বৈধতা নিয়ে খোদ লন্ডনে প্রশ্ন ওঠায় ১৮৩৬ সালে এটিকে বিলুপ্ত করা হয়। আবার ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফিভার হসপিটাল কমিটির তথ্যাদি ও সেই কমিটির কাছে উত্তর ও মধ্য কলকাতার বাসিন্দাদের প্রদত্ত সাক্ষ্য থেকে। জানা যায় যে, খাস শহর এলাকায় কৃষিজমি আর ছিল না এবং দেশীয় জনসাধারন অধ্যুষিত এলাকা জনবহুল হয়ে উঠেছিল।


ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত কলকাতা ছিল প্রধানতঃ কুঁড়ের শহর। ক্রমে কুঁড়ে গুলি রুপান্তরিত হয় জনাকীর্ন বস্তিতে। বস্তিগুলিতে বসবাস করতো নানা জাতি, বর্ন, সম্প্রদায় ও বৃত্তির শ্রমজীবি মানুষ। বস্তিগুলিকে বাজার কলকাতার আবাসস্থল বলা চলে। রোজার গুলির মতোই বস্তিগুলিও সর্বজনীন (কসমোপলিটান) রুপ পরিগ্রহ করেছিল। এই কসমোপলিটান চরিত্রের কারনেই নগর কলকাতার সমাজ কাঠামো দৃঢ় বদ্ধ হতে পারে নি। বৌবাজার বা ধর্মতলার মতো পাঁচমিশেলী এলাকার সামান্যতম কারনেই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার আছিলায় বিভিন্ন গোষ্ঠী। অন্যদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে গুটিয়ে নিত।


উনিশ শতকে কলিকাতার চারিপাশে এই ভাবে শহর এলাকার ক্রমবিস্তারের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ ও প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু সাধারন বাঙালী এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে চলতে পারেনি। সে নিজেকে তার চিরপরিচিত সনাতন গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিল। বাঙালীর পেশাগত পরিচিতি এই সনাতন গন্ডীকে কদাচিৎ অতিক্রম করতে পেরেছিল। এমনকি, যে বসত এলাকা সে গড়ে তুলেছিল তার সর্বাঙ্গে সনাতন পরিবেশের স্থান। ট্যাতিন পরিবেশ মূর্ত হয়ে উঠেছিল চিরপরিচিত মুদিখানা, তেলের ঘানি, মন্দির, জঙ্গ লে, জীন গৃহ ও কুঁড়ের মধ্যে। এই সনাতন পরিবেশ কসমোপলিটান নগর কলকাতার বাঙালিকে তার ফেলে আসা গ্রাম বাংলার বদি এনে দিত। 

Next Post Previous Post