আপনার বয়স চেক করুন বয়স ক্যালকুলেটর দিয়ে! Click here. সময়ের হিসাব করুন Hours Calculator দিয়ে! Click here.

ব্রিটিশ শাসনে ভারতে আদিবাসী, ও দলিত সম্প্রদায়ের আন্দোলনের বিবরণ দাও৷



ঊনবিংশ শতকে বাংলার কৃষক আন্দোলনের সম্প্রসারণ, কোল, হুল, মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি কৃষক সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ

উচ্চমাধ্যমিক: ব্রিটিশ শাসনে ভারতে আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের আন্দোলনের বিবরণ দাও৷


বাংলাতে বেশ কিছু কৃষক আন্দোলন ঘটেছিল। এবং বাংলার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলজুড়ে এগুলি বিস্তার লাভ করেছিল। ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন দৃষ্টি কোন থেকে কৃষক বিদ্রোহকে দেখেছেন। কৃষকরা কাদের বিরুদ্ধে এবং কেন বিদ্রোহ করে এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। তাছাড়া কৃষক বিদ্রোহের গভীরতা, ব্যপ্তি বা জাতীয় চরিত্র সম্পর্কের। বিতর্ক দেখা যায়। এপর্যন্ত ভারতের কৃষক বিদ্রোহকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হয়েছে অনেকে ধরে নেন কোন কৃষক বিদ্রোহের পিছনে তাদের আর্থ সামাজিক কারণ যুক্ত থাকে। রনজিৎ গুহ প্রথম এই কারনকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন যে কৃষক শুধুমাত্র আর্থ-সামাজিক অত্যাচারের কারনেই বিদ্রোহ করে না। তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করেননি। তিনি 'Elementary Aspects of peasants insurgency in colonial India' গ্রন্থে কৃষককে শুধু এক অর্থনৈতিক স্বত্ত্বা বলতে চাননি। কৃষকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বত্ত্বা রয়েছে। তার মতে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস আংশিক ভাবে কৃষকবিদ্রোকে তুলে ধরে। এক সর্বাঙ্গীন ধারনা গড়ে তোলার জন্য দরকার সামাজিক বিষয়ের উপর বিচার বিশ্লেষন। কৃষক নিছক ব্যক্তিস্বত্ত্বা নয় তার যৌথ স্বত্ত্বা রয়েছে বস্তুতঃ একটি সুনির্দিষ্ট ভেদরেখার দ্বারা শান্ত ও বিদ্রোহী কৃষকের পার্থক্য তৈরী করা যায়।

ডঃ গুহ মনে করেন শান্ত ও বিদ্রোহী কৃষকের মনস্তত্ত্ব দুটি বিপরীত মেরুতে বিরাজ করে। বিদ্রোহী কৃষকের মনস্তত্ত্ব বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সমস্যার দ্বারা তৈরী যা নিছক অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার দ্বারা গড়ে ওঠে না। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। রনজিৎ গুহ বিদ্রোহী কৃষকের। মনস্তত্ত্বকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন - 
  • (i) Negation 
  • (ii) Ambiguity 
  • (iii) Modality 
  • (iv) Soliderity 
  • (v) Transmission 
  • (vi) Territoriality

ডঃ গুহ কৃষক আন্দোলনের স্বশাসনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে কৃষকরা নিজেদের মত করে। আন্দোলন পরিচালনা করেছে। উচ্চবর্গের ঐতিহাসিকরা এই ভুল ধারণা গড়ে তুলেছিল যে বাইরের নেতাদের দ্বারা আন্দোলন গড়ে উঠেছে। কারন তারা ঔপনিবেশিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করেছিল। আর ঔপনিবেশিক সরকার বিশ্বাস করত না যে কৃষকদের নিজস্ব সত্ত্বা আছে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় কোল, হল, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি বিদ্রোহগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। এরা উপজাতি হলেও এগুলি ছিল কৃষক বিদ্রোহ। সুতরাং ওই যা দাবি করেছেন তা হল কৃষকদের একটি স্বতন্ত্র সত্ত্বা আছে যা আদৌ কোন বাইরের প্রভাবে প্রভাবিত নয়। সাধারণ অবস্থায় এই সত্ত্বা নিষ্প্রভ, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু বিদ্রোহের সময় এটি প্রকট রূপ গ্রহন করে। উচ্চবর্গের ঐতিহাসিকরা মূলত কৃষকদের উৎপাদক সত্ত্বা নিয়েই আলোচনা করেছেন। কিন্তু গুহের মতে এর বাইরেও তাদের একটা সাংস্কৃতিক সত্ত্বা আছে সেটা হল নিজের গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য। 

বিদ্রোহের সম্প্রসারণ সম্পর্কে বলা যায় এই সময় ছিল অসম্পূর্ণতা ও অনগ্রসরতার যুগ। তবুও গোষ্ঠী ৯ নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুসারে একটা আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিত। ১৮৫৭ খ্রীঃ বিদ্রোহের একটা বড় অংশ ছিল কৃষক আন্দোলন। এই বিদ্রোহ অযোধ্যা, আজিমগড়, জৌনপুর, বারাণসী থেকে ফৈজাবাদ পর্যন্ত সংক্রমনের মত ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮৩২ খ্রীঃ কোল এবং ১৮৫৫ খ্রীঃ সাঁওতাল বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও সংক্রমন কথাটির ব্যবহার দেখা গেছে। গ্রামাঞ্চলের কিছু বেপরোয়া মানুষ যারা কোন দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে একত্রিত নয় তারাই এই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে সরকার মনে করে। বৃটিশ ঐতিহাসিকরা কৃষক আন্দোলনগুলিকে স্বতঃস্ফূর্ত, আকস্মিক এবং অগ্ন্যুৎপাতের ন্যায় বলে বর্ণনা করেছেন। সরকারি রিপোর্টগুলি থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ছোটনাগপুর অঞ্চলে যখন কোলরা বিদ্রোহ করছে তখন পালামৌ পর্যন্ত ৫ দিনের মাথায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে। সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় দামিন-ই-কোহ, সাহেবগঞ্জ, পাকুড়, বীরভূেম মাত্র ৩ দিনের মাথায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামসীর মতে বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পিছনে কৃষক সমাজের নিজস্ব ধরন কাজ করেছে।

জর্জ লেভের তার ‘French Revolution' গ্রন্থে দেখিয়েছেন কিভাবে উচ্চবর্গের তুলনায় নিম্নবর্গের বিদ্রোহ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে কিছু উপকরণ কাজ করে। এগুলির মধ্যে অন্যতম হল মৌখিক বক্তব্য এবং যোগাযোগের ও খবর আদান-প্রদানের আদিম কিছু ব্যবস্থা, যেমন—ঢাকের শব্দ, মাদলের আওয়াজ ইত্যাদি । গুহ বলেছেন বিদ্রোহ ছড়ানোর ক্ষেত্রে দুটি ধরন কাজ করত মৌখিক এবং অ-মৌখিক। মৌখিক বিষয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হল গুজব। গুহ এই গুজব এর কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন -
  • (১) গুজব হবে অনামা অর্থাৎ এর স্রষ্টা কে তা জানা যায় না। 
  • (২) গুজব মানেই এটি সার্বজনীন। 
  • (৩) এর মধ্যে একটা অস্পষ্টতা আছে। 
  • (৪) গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 
  • (৫) গুজবের একটা সংযোজনশীলতা আছে। 
  • (৬) এর একটা বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, যা সবাই বিশ্বাস করে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের সময়ও গুজবের মাধ্যমে অনেক খবর ছড়িয়েছিল। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়—সাঁওতাল সমাজে একটি প্রথা ছিল যে সমসংখ্যক সন্তানের মা এমন মহিলারা এক সঙ্গে খাবেন উপহার বিনিময় করবেন।। এর ফলে একটা ভগ্নীত্ববোধ গড়ে ওঠে। এই সব অনুষ্ঠানের মধ্যেও খবর আদান-প্রদান হত। আর একটি উদাহরণ হল – সাওতাল সমাজে এমন একটা গুজব রটে গেল যে ভাগনাডিহির পাড়ে একজন ঠাকুর তোত্মপ্রকাশ করেছেন। প্রচুর সাঁওতাল দুধ, চাল, ফল নিয়ে ঠাকুর দর্শন করতে গিয়ে দেখেন সেখানে সিধ বসে আছেন। আসলে সিধু নিজেকে একজন ঈশ্বরের প্রতিনিধি প্রমান করতে চেয়েছিলেন। যাতে সাঁওতাল সমাজ সহজেই তাকে নেতা হিসাবে। মেনে নেয়। নিজেদের জারি করা পরোয়ানাকে তারা বলতেন ঠাকুরের পরোয়ানা। কোন রকম গোপনীয়তা বজায় রেখে নয় রীতিমত ঘোষণা করে তারা যে কোন জায়গা আক্রমন করতে যেতেন। গুজব থেকেই তাদের মনে একটা ধারনা জন্মায় যে ইংরেজদের গুলি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের গুলিতে একজনের মৃত্যু হলেও পাশের সাঁওতাল তা বিশ্বাস করতে পারে নি গুজবের বিশ্বাসযোগ্যতা এতটাই বেশী ছিল।

বিদ্রোহ ছড়ানোর ক্ষেত্রে আর একটি ধরন হল অ-মৌখিক উপাদান। এটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— চাক্ষুষ বা দৃশ্য এবং শ্রাব্য বা শব্দ। সাঁওতাল বিদ্রোহের আগে দেখা যায় বেশ কিছু সাঁওতাল বলদ নিয়ে পায়ে ঘুঙুর পরে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন। এটা একটা আসন্ন বিদ্রোহের প্রতীক। নারায়নপুরের বাজার যখন সাঁওতালরা লুঠ করেছিলেন তখন মাদল বাজিয়ে ও শিঙা ফোকার আওয়াজের মধ্যে তারা খবর সম্প্রসারিত করেছিলেন। পাবনার বিদ্রোহীরা মোষের শিঙা ফুঁকে বিদ্রোহের খবর ছড়িয়ে দেন। কোল বিদ্রোহের সময় নাকড়ার আওয়াজের মাধ্যমে বিদ্রোহের খবর ছড়িয়ে পড়ার কথা জানা যায়।

আবার তিনটি পাতা বিশিষ্ট ছোট গাছের ডাল বাদি কোন বাড়ির সামনে রাখা হয় যেমন-জমিদার, মহাজন এবং আড়তদার তাহলে বুঝতে হবে তার মেয়াদ আর তিন দিন। আবার কোল বিদ্রোহের সময় ছোট ছোট পাতা বিশিষ্ট বড় গাছের ডাল এর কথা পাওয়া যায়। ছোট পাতাগুলি যখন একবারে শুকিয়ে যাবে তখন সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগনকে আক্রমন করা হবে। বিদ্রোহের পূর্বে সিধু কানু দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তেল, সিঁদুরের ব্যবহার করেছিলেন। ১৮৫৭ খ্রীঃ মহাবিদ্রোহের সময় চাপাটির মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ার কথা জানা যায়। চাপাটির সংখ্যা, চাপাটির আকৃতি, চাপাটির কোন অংশ ছেড়া আছে কিনা—এগুলি এক একটি খবরের ইঙ্গিত বহন করত। আবার শালপাতার কাপের ব্যবহারের কথা জানা যায়। এই কাপ যারা ব্যবহার করবে ধরে নিতে হবে তারা একাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এই ভাবেই কৃষক আন্দোলনের খবর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। 
Next Post Previous Post