চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর আলোচনা

Queries : 
  1. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী?
  2. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্য গুলি কি ছিল? চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের কারণ কি?
  3. কর্নওয়ালিশ কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রকৃত উদ্ভাবক? 
  4. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুরুত্ব কী? 
  5. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সীমাবদ্ধতা
  6. সূর্যাস্ত আইন কি?
  7. জমিদার শ্রেণীর উপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী প্রভাব ফেলেছিল ? 
  8. কৃষকদের উপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব কি ছিল?
  9. পত্তনী প্রথা বলতে কী বোঝ?

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর


১) 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' কী?

লর্ড কর্নওয়ালিশ নির্দিষ্ট পরিমাণে রাজস্ব কোম্পানীকে প্রদানের বিনিময়ে জমিদারদের সাথে দশবছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করেন। তারপর কোম্পানীর পরিচালক মণ্ডলীর অনুমোদনক্রমে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব কোম্পানীকে প্রদানের বিনিময়ে জমিদারদের সাথে চিরকালীন ভিত্তিতে জমি বন্দোবস্ত করেন যা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত।

২) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্য গুলি কি ছিল?
বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের কারণ কি?

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পশ্চাতে কর্নওয়ালিশের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—
  • ১। চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমি রাজস্ব আদায় সুনিশ্চিত করা।
  • ২। কোম্পানীর অনুগ্রহ পুষ্ট জমিদার শ্রেণী গড়ে তোলা।
  • ৩। স্থায়ী জমিদারী স্বত্ব প্রদানের বিনিময়ে জমিদারদের কৃষ্টি উন্নতিতে উৎসাহ দেওয়া।
  • ৪। কৃষি উন্নতির মাধ্যমে শিল্প উন্নতিকে দ্রুত করা।
  • ৫। অনুগ্রহ পুষ্ট জমিদারদের দ্বারা বাংলার গণ অভ্যুত্থান দমন করা।

৩) কর্নওয়ালিশ কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রকৃত উদ্ভাবক? 

কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন করলেও বহু পূর্ব থেকে কোম্পানীর কর্মচারীদের মধ্যে এবিষয়ে আলোচনা চলছিল। ফিজিও ক্রাট দর্শনে বিশ্বাসী হেনরী পেট্রলা ১৭৭২ খ্রীঃ এবং ফিলিপ ফ্রান্সিস ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারের কাছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুপারিশ করেন। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে পিটের ভারত শাসন আইনেও এ বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। তাই বলা যায় কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তক, উদ্ভাবক নন।

৪) চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুরুত্ব কী? 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুরুত্ব হল—এই ব্যবস্থার ফলে,
  • ১। কোম্পানীর বাৎসরিক আয় সুনিশ্চিত হয় এবং বাজেট তৈরী সহজতর হয়। 
  • ২। জমির ওপর স্থায়ী স্বত্ব পেয়ে জমিদাররা কৃষি উন্নতিতে মনোনিবেশ করে।
  • ৩। সরকারের অনুগত রাজভক্ত জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হয়।
  • ৪। কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় সহজতর হয়। 

৫) চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

এই বন্দোবস্তের ত্রুটিগুলি হল—এই বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ফলে
  • ১) ভূমি রাজস্ব থেকে ভবিষ্যতে আয়বৃদ্ধির সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে যায়।
  • ২) নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে না পারায় বহু জমিদার জমিদারীচ্যুত হয়।
  • ৩) জমিদারত্বে স্থায়ী স্বত্ব পেয়ে জমিদারদের মধ্যে জমি বিক্রির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
  • ৪) পত্তনি প্রথার উদ্ভব হয়।
  • ৫) প্রাচীন জমিদারদের অপসারণে ভূঁইফোর জমিদারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কৃষকের শোষণ বৃদ্ধি পায় প্রভৃতি।

৬) সূর্যাস্ত আইন কি?

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুসারে প্রতি জমিদার বছরের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূরে নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান করতে পারলে তবেই জমিদারী স্বত্ব ভোগ করতে পারতো। অন্যথা তার জমিদারী কোম্পানী বাজেয়াপ্ত করত। এই আইন 'সূর্যাস্ত আইন' নামে পরিচিত।

৭) জমিদার শ্রেণীর উপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী প্রভাব ফেলেছিল ? 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে—
  • ১। জমিদাররা জমির মালিকে পরিণত হয়,
  • ২। বিচার ও পুলিশি ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া জমিদারদের ক্ষমতা হ্রাস পার, 
  • ৩। সূর্যাস্ত আইনের চাপে বহু জমিদার জমিদারীচ্যুত হয়,
  • ৪। পুরনো জমিদারদের স্থলে বহু শিল্পপতি জমিদার হয়ে ওঠে।

৮) কৃষকদের উপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব কি ছিল?

  • ১। কৃষকরা জমির মালিকানা বঞ্চিত হয়।
  • ২। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের জন্য কৃষকদের উপর শোষণ বৃদ্ধি পায়। 
  • ৩। কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

৯) পত্তনী প্রথা বলতে কী বোঝ?

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুসারে নির্দিষ্ট দিনের রাজস্ব পরিশোধ ও বিনা আয়াসে রাজস্ব আদায়ের জন্য জমিদাররা তাদের জমিদারীকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে কিছু ব্যক্তিকে বন্দোবস্ত দেন। এই ব্যবস্থা 'পত্তনী ব্যবস্থা' নামে পরিচিত। এবং পতনী প্রাপক 'পত্তনী দার' নামে পরিচিত। বর্ধমানের জমিদার তেজচন্দ্র প্রথম পত্তনী ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।
Next Post Previous Post