ব্রিটিশ ভারতে খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যাবলী আলোচনা কর


ঊনবিংশ শতাব্দী হলো এক বিশাল পট পরিবর্তনের যুগ। এই পট পরিবর্তনে খ্রিস্টান মিশনারিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই খ্রিস্টীয় ধর্মপ্রচারকদের কার্যকলাপের পশ্চাদপটকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

  • (ক) ইংল্যান্ডের ধর্মীয় সামাজিক পশ্চাদভূমি, যা মিশনারিদের কার্যকলাপের বা ধর্মপ্রচারের জন্ম দিয়েছিল।
  • (খ) বাংলার ধর্মীয় সামাজিক প্রেক্ষাপট যা মিশনারিদের কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছিল।


বাংলার পরিস্থিতি ছিল মিশনারিদের কাজের পক্ষে উপযুক্ত। সাধারণত বাংলার প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যকলাপের সূচনা ধরা হয় উইলিয়াম কেরির আগমনের বছর (১৭৯২) থেকে। যদিও তার আগেও কেউ কেউ এই রকম কাজ করেছেন। বস্তুতপক্ষে কেরি, মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড তিনজনে মিলে একটি দল করলেন এবং তারাই বাংলার মিশনারিদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকলাপের সূচনা ঘটালেন। প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে এবং প্রভাবজনক ভাবে মিশনারিদের কার্যকলাপ শুরু হয় শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের মাধ্যমে (১৮০০ খ্রিস্টাব্দে)। ধর্মপ্রচারের জন্য মিশনারিরা দুটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। এক দিকে তারা যিশুর বাণী প্রচার করেছিল ও তার সঙ্গে যিশুর অলৌকিক ক্ষমতার কথাও সবিস্তার প্রচার করেছিল। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মকে ছোটো করা হয়েছিল এবং এর সমাজবদ্ধ যে অমানবিক প্রতিক্রিয়াগুলো প্রচলিত আছে তাও তুলে ধরা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, ভারতীয়রা ভবিতব্য, কর্মফল ইত্যাদিতে বিশ্বাস করত। তারা মনে করত সবকিছুই নিয়তির দ্বারা নির্ধারিত। তাই তারা এই নতুন মুক্তির বাণী বা যিশু প্রচারিত ধর্মমতকে সহজ ভাবে গ্রহণ করতে বিমুখ হলো। তাই মিশনারিরা একটা নতুন নীতি গ্রহণ করল। সমগ্র ভারতে সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোকে নিন্দা করা এবং ভারতীয়দের জীবনধারণ ও দৃঢ় বিশ্বাসে আঘাত করা ছিল এই নীতির বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়াও যিশুর বাণী মাতৃভাষায় অনুবাদ করে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। উইলিয়াম ওয়ার্ড ও পঞ্চানন কর্মকারের সাহায্যে শ্রীরামপুর প্রিন্টিং প্রেসের মাধ্যমে এই কাজ মিশনারিদের পক্ষে অনেক সহজ হয়ে গেল।

মিশনারিদের মুখ্যত লেখাপড়ার কাজ ছিল বাইবেলের অনুবাদ এবং ক্ষুদ্র পুস্তিকা তৈরি করা। কেরির মুনশি রামরাম বসু বাংলায় বাইবেলের অনুবাদ করতে কেরিকে সাহায্য করেন। উইলিয়াম কেরি, শ্রীরামপুর মিশন এবং ফোর্ট উইলিয়ামের মিলিত কাজের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। এ ছাড়া তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কিছু পণ্ডিত ও মুনশিকে উৎসাহিত করেছিলেন বাংলা ভাষায় কিছু বই লেখার জন্য। রামরাম বসু ইতিহাসের ওপর লেখেন প্রতাপাদিত্য চরিত, যা ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রথম দিককার এই সকল বাংলা গদ্যে দুর্বলতা ছিল। এগুলিতে পারসিক ও আরবিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কেরির অন্যতম অবদান ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ঘটানো। তিনি বাংলা ভাষাকে বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মিত ধারার ভাষ্যে পরিণত করেছিলেন।

মিশনারিদের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সাংবাদিকতার উন্নতি ঘটানো। যেটা বাংলা ভাষাকে উন্নত হতে উৎসাহিত করেছিল এবং এটি বাংলা - ভাষায় একটা সুনির্দিষ্ট ভাবধারার প্রবেশ করার হাতিয়ার হয়েছিল। এ ছাড়া শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা সমাচার দর্পণ প্রকাশ করে। তা ছাড়া মার্শম্যান সম্পাদিত ইংরেজি মাসিক পত্রিকা The Friend of India প্রকাশিত হয়।

মিশনারিরা শিক্ষাবিস্তারের এই বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তাদের ঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই শিক্ষা ছাত্রদের বোঝাতে সক্ষম হবে এবং তাদের নিজস্ব ধর্ম অপেক্ষা খ্রিস্টধর্ম অনেক মহান। তাদের স্কুলগুলিকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে—
  • (ক) ইউরোপীয় ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতে মিশনারি করে তোলার জন্য আবাসিক স্কুল ;
  • (খ) যে সব শিশুরা সামাজিক সম্মান হারিয়েছে তাদের জন্য স্কুল; 
  • (গ) ভারতীয় খ্রিস্ট ছেলেমেয়েদের জন্য আবাসিক স্কুল;
  • (ঘ) রোমান ক্যাথলিক ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল; 
  • (ঙ) আঞ্চলিক অখ্রিস্টান ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল।

কেরি জনগণের মধ্যে শিক্ষাকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। সেইজন্য তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অনুপস্থিতির। হার কমানোর জন্য বিভিন্ন রকম পদ্ধতি গ্রহণ করেন।
  • (ক) উপস্থিতির জন্য টাকা দেওয়া হতো এবং বিশেষ পুরস্কার দিয়ে উৎসাহ প্রদান করা হতো;
  • (খ) ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো;
  • (গ) উপস্থিতির হার ঠিক করার জন্য কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। পিওন ও কর্মচারীদের কর্তব্য ছিল অনুপস্থিতির কারণ বের করা;
  • (ঘ) ভবিষ্যতে বৈষয়িক উন্নতির আশায় বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার জন্য ব্যাপক উৎসাহ দেখায়। তাই মিশনারিদের দ্বারা ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় এই আশায় যে ভবিষ্যতে ইংরেজি শিক্ষিত যুবকদের যিশুর ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা যাবে;
  • (ঙ) তাদের পরিকল্পনায় নারী শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। মিশনারিরা এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। মার্শম্যানের উদ্যোগে শ্রীরামপুর মেয়েদের আবাসিক স্কুল তৈরি হয় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে;
  • (চ) বাংলার নারীদের এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার জন্য Female Juvenile Society তৈরি হয়;
  • (ছ) উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও মিশনারিরা বিশেষ পদক্ষেপ নেয়। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়।

মিশনারিদের কার্যকলাপের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তাদের সাফল্য ছিল প্রাস্তিক। সে সময়ে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি সমাজে আগ্রহ দেখা যায়। এমনকি রক্ষণশীল গোষ্ঠীর রাজা রাধাকান্তদেব এবং রামকমল সেন প্রমুখ এর সপক্ষে ছিলেন। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার রাস্তার মানুষকে খ্রিস্টধর্মে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বিশেষ সফল হয়নি। মিশনারিরা শুধু প্রকৃত ধর্মান্তরকরণের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়নি, পুরোপার সংস্কার করতেও ব্যর্থ হয়েছিল। তার কারণ হলো যথাক্রমে—
  • (ক) মিশনারিরা তাদের কাজের শুরুতেই সরকারের ক্ষমতার মুখোমুখি হয়েছিল। সরকার ভারতীয় প্রজাদের ধর্ম ও কুসংস্কারে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত ছিল না;
  • (খ) তাদের সেইসব ভারতে আসা ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের বিরোধিতার সম্মুখীন। হতে হয়েছিল যারা ইতিমধ্যে অখ্রিস্টান ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল;
  • (গ) মিশনারিদের কার্যকলাপ একমাত্রিক ছিল না, বাংলার মিশনারি সোসাইটিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেনি; 
  • (ঘ) মিশনারিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজের অতিরিক্ত সমালোচনা করা।

মিশনারিরা উদারপন্থী ভারতীয়দের মধ্যে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, সেখানে আন্দোলনের একটা গোড়াপত্তন হয়েছিল। সেগুলি হলো—
  • (ক) হিন্দুধর্মকে সংস্কার করে মিশনারিদের সমালোচনা হাত থেকে মুক্ত করা; 
  • (খ) মিশনারিদের বিরোধী প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করা; 
  • (গ) সরকারি শিক্ষার সিলেবাসে ও প্রতিষ্ঠানে খ্রিস্টধর্মের সংবাদ যুক্ত করার ক্ষেত্রে সরকারকে বাধা দেওয়ার জন্য; 
  • (ঘ) মিশনারিদের হেফাজত থেকে ধর্মান্তরিতদের মুক্ত করার জন্য।

যদিও খ্রিস্টান মিশনারিরা তাদের মূল উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছিল কিন্তু তৎকালীন বাংলার এবং অবশেষে ভারতের জীবন ও মননে তাদের একটা বিশেষ প্রভাব পড়েছিল। ভারতের সমাজ ও ধর্ম ব্যবস্থাকে তারা আক্রমণ করার ফলে ভারতের প্রাচীন সংস্কার সম্পর্কে ভারতীয়দের চোখ খুলেছিল। তারা এই সমাজে একটা আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতে সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হওয়ার পশ্চাতে তাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্য সহশিক্ষা চালু করার পথপ্রদর্শক ছিল এই মিশনারিরা।

পরিশেষে বলা যায় যে, তারা ডাক্তারি ক্ষেত্রে কুষ্ঠ রোগীদের হাসপাতাল নির্মাণ করে, কৃষিকার্যের সংস্কারের ব্যবস্থা করে। যদিও তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টধর্মের বিস্তার ঘটানো, কিন্তু তাদের বহুমুখী কার্যকলাপের ফলে ভারতীয়দের কাছে নতুন পথের উন্মোচন হয়। খ্রিস্টান মিশনারিরা যে নব্য চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন তার ফলে ভারতীয়দের মধ্যে জাগরণ দেখা দেয় এবং এই জাগরণই বাংলার তথাকথিত রেনেসাঁসের জন্ম দেয়।

Next Post Previous Post