অশোকের ধম্মের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য - ইতিহাস পাঠশালা

অশোকের ধম্মের চরিত্র সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। এক শ্রেণির ঐতিহাসিকেরা মনে করেন অশোকের ধম্ম বৌদ্ধধর্ম ছিল। আরেক শ্রেণির ঐতিহাসিকের কাছে তাঁর ধম্ম বৌদ্ধধর্ম বা বিশেষ কোনও ধৰ্ম্ম নয়।

অশোক ছিলেন ভারতের এক মহান সম্রাট, যিনি ২৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাটলিপুত্রর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন পিতা বিন্দুসারের উত্তরাধিকারী হিসেবে। তাঁর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব ছিল পূর্বপুরুষদের সৃষ্ট বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যকে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করা এবং প্রজাদের জাগতিক ও পারলৌকিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য কঠোর পরিশ্রম করা। তবে অশোক বিখ্যাত হয়েছিলেন তাঁর ধৰ্ম্মের জন্য। অশোকের ধম্ম নীতি ঐতিহাসিকদের মধ্যে বহু বছর ধরে একটি বহুল আলোচনার বিষয়। ধর্মের নীতি গ্রহণ করে অশোক কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিলেন বা তাঁর ধর্ম্মের প্রকৃত চরিত্র কী ছিল, এই ধরনের নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অশোক এমন একটি সামাজিক বেষ্টনীতে জড়িয়ে ছিলেন যার ফলে তিনি যে বৌদ্ধ, জৈন বা আজীবিকের মতো ধর্মীয় চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

কলিঙ্গ যুদ্ধের পর সমগ্র মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ঐক্যকরণ সম্পূর্ণ হয়েছিল। এর সঙ্গে এসেছিল একটি অর্থনৈতিক রূপান্তর। ডি. ডি. কোসাম্বির মতে, এ যুগের পশুপালন কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কৃষি অর্থনীতি জয়লাভ করেছিল। উপরন্তু এই সময়ে বৈশ্য শ্রেণির প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। ব্রাহ্মণদের বৈষম্যমূলক নীতির হাত থেকে রক্ষা পেতে তারা বৌদ্ধ ধর্মের সমতার নীতির প্রতি বিশেষ আগ্রহী হয়। রাষ্ট্রের পূর্ণ সম্প্রসারণ সম্পূর্ণ করার পর অশোক তাঁর সাম্রাজের অভ্যন্তরস্থ সামাজিক বিরোধগুলির অবসান ঘটাতে চান। ব্রাহ্মণ, বৈশ্য প্রভৃতি শ্রেণির মধ্যে গোলযোগ থামাবার জন্য তিনি এমন একটি নীতি গ্রহণ করতে চান, যার দ্বারা রাজার হাতেই নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা থাকে। রোমিলা থাপর বলেছেন, এই নিয়ন্ত্রণ রাজার হাতে থাকে দুভাবে— যেখানে রাজা বলপ্রয়োগ করে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন, অথবা, রাজা নিজে যদি জনগণের সঙ্গে কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। অশোক জনসাধারণের সমর্থন লাভের নীতি হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মকেই সমর্থন শুরু করেন। তবে তিনি সরাসরি রক্ষণশীলদের আক্রমণ করেননি।

অশোক ধৰ্ম্মের নীতি গ্রহণে রাজনৈতিক সুবিধার দিকে দৃষ্টি দেন। এর ফলে, তাঁর সাম্রাজ্যের ঐক্যকরণ আরও দৃঢ় হয়। তাই ধর্মকে তিনি রাষ্ট্রনীতির অচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করেন। প্রথম শিলালেখতে, অশোক তার সাম্রাজ্যে পশুবলি ও প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ করেন। পশুবলি নিষিদ্ধ করাকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে আলোকের অসহিষ্ণুতার পরিচায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। থাপর মনে করেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে পশুবলি নিষিদ্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ ছিল এই সব সামাজিক জমায়েত থেকে পুঞ্জীভূত হওয়া প্রজাবিদ্রোহকে বিনাশ করা।

দ্বিতীয় শিলালেখতে, অশোকের কিছু সমাজসেবামূলক নীতির পরিচয় পাওয়া যায়, যা ছিল ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত। মানুষ ও পশুর জন্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, কূপ খনন, বৃক্ষরোপণ প্রভৃতি ছিল তাঁর জনকল্যাণ নীতির অঙ্গ। চতুর্থ শিলালেখতে উল্লেখ করা আছে, তাঁর ধম্ম প্রচারের উদ্দেশ্য হলো প্রজাদের নৈতিক উন্নতি সাধন করা। অশোক পঞ্চম শিলালেখতে প্রথম ধর্ম মহামাত্যদের সঙ্গে তৎকালীন কোনও ধর্মমতের বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের তেমন যোগ ছিল না, কারণ এরা সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। সপ্তম শিলালেখতে, অশোক সব ধর্মের জন্য সহিঞ্চুতার বাণী প্রচার করেন। দ্বিতীয় ও সপ্তম শিলালেখতে অশোক তাঁর ধর্ম্মের অন্তর্নিহিত গুণাবলি উল্লেখ করেছেন। যেমন, দয়া, দান, সাচে (সত্য), শোচয়ে (সুচিন্তা), মাদরে (ভদ্রতা) ইত্যাদি। যাঁরা তাঁর ধম্ম গ্রহণ করবেন তাদের কর্তব্য ও কর্মের নির্দেশও অশোক দিয়েছেন।

অশোকের ধম্মে নির্দেশিত কর্তব্য ও কর্ম

  • (ক) প্রাণী হত্যা না করা 
  • (খ) জীবিত প্রাণীর ক্ষতি না করা
  • (গ) পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা
  • (ঘ) বয়স্ক জনের প্রতি শ্রদ্ধা
  • (ঙ) গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা
  • (চ) ভৃত্য বা ক্রীতদাসের প্রতি ভদ্র আচরণ
  • (ছ) অল্প ব্যয় এবং অল্প সঞ্চয়

অশোকের ধম্মের চরিত্র সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। এক শ্রেণির ঐতিহাসিকেরা মনে করেন অশোকের ধম্ম বৌদ্ধধর্ম ছিল। আরেক শ্রেণির ঐতিহাসিকের কাছে তাঁর ধম্ম বৌদ্ধধর্ম বা বিশেষ কোনও ধৰ্ম্ম নয়। অশোকের ধম্মকে বৌদ্ধ ধর্মের সমার্থক বলা যায় কিনা এ বিষয়ে পূর্বে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলে বর্তমানে এ বিতর্কের অবসান ঘটেছে বলে ধরা হয়।

যে সমস্ত পণ্ডিত অশোকের ধম্ম ও বৌদ্ধ ধর্মকে এক ও অভিন্ন বলে মনে করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডি. আর. ভান্ডারকার। তাঁর মতে, অশোক নিঃসন্দেহে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথাগুলি প্রচার করেছিলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় অপ্রধান শিলালেখতে অশোক বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কথা বলেছেন। এই দুটি লেখ থেকে এ কথা স্পষ্ট যে অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তা ছাড়া রুশ্মিদেই স্তম্ভলেখ-তে অশোক বুদ্ধের জন্মভূমি পরিদর্শন ও সেখানকার মানুষদের কর থেকে অব্যাহতি দানের কথা উল্লেখ করেছেন। ভান্ডারকার তাঁর তত্ত্বকে সুদৃঢ় করার জন্য অশোকের লেখমালায় উদ্ধৃত ধম্ম সংক্রান্ত বিষয়গুলির সঙ্গে বৌদ্ধ জগতের অন্যতম গ্রন্থ ধম্মপদ ও দীর্ঘনিকায়-এর অন্তর্ভুক্ত ‘লক্ষণসুত্তম্ভ'-এ উল্লিখিত ধর্মীয় নীতিগুলির সাদৃশ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সর্বোপরি, এতে গৃহীদের জন্য যে স্বর্গের কথা বলা হয়েছে অশোকের লেখাগুলিতেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়। তৃতীয় অপ্রধান শিলালেখর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন ভান্ডারকার। বুদ্ধদেব, বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ সংঘের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগের কথাও অশোক এতে স্বীকার করেছেন। ভান্ডারকারের বক্তব্য হলো, যেহেতু বৌদ্ধ ধর্ম পুস্তকগুলি অশোক তাঁর লেখতে লিপিবদ্ধ করেছেন, সেহেতু তাঁর ধৰ্ম্ম ছিল বৌদ্ধ ধর্ম।

অশোকের ধম্ম যে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে এক ও অভিন্ন নয় তার পেছনেও যথেষ্ট যুক্তি দেখিয়েছেন কিছু ইতিহাসবিদ। যেমন -রিস ডেভিস, ডি. ডি. কোসাম্বি, ডি. সি. সরকার। রোমিলা থাপার প্রমুখ, ঐতিহাসকেরা অশোকের লেখমালাকে দুভাগে ভাগ করেছেন এবং দুটি ভাগের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। এর মধ্যে সারনাথ ও লুম্বিনী লেখকে তাঁরা অশোকের ব্যক্তিগত লেখ বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলি ব্যক্তিগত লেখ হওয়ায় ধম্মের প্রকৃতি নির্ধারণের জন্য এই লেখগুলির ওপর নির্ভর করা যায় না। তাঁরা বলেন, বৌদ্ধধর্ম হলো ব্যক্তি অশোকের ধর্ম এবং তা সম্রাট অশোকের ধর্ম নয়। রোমিলা থাপরও অশোকের ধম্মকে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে অভিন্ন করে দেখার প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন। যে নৈতিক আচরণের কথা অশোক প্রচার করেছিলেন সেগুলি খাঁটি বৌদ্ধ ধর্মের সারবস্তু নয়।

দীনেশ চন্দ্র সরকার মনে করেন যে, অশোকের প্রচারিত ধম্ম ছিল বিভিন্ন নীতির সমন্বিত রূপ। তা মোটেই নিটোল বৌদ্ধধর্ম নয়। এ ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম প্রধান ভিত্তি অষ্টাঙ্গিক মার্গ ও নির্বাণ লাভ সম্পর্কেও অশোক তাঁর ধম্মে কোনও কথা বলেননি। এ সব কিছুর পরিবর্তে তাঁর ধর্ম্মে স্বর্গলাভ ও পরলোকে শাস্তিলাভের কথা ঘোষিত হয়েছে।

সম্ভবত, অশোক তাঁর রাজত্বের বাকি সমস্ত সময়টি ধম্ম প্রচারের কাজে লিপ্ত ছিলেন এবং এ ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সফল হয়েছিলেন। কেবল স্বদেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলিতে এবং দূরবর্তী রাষ্ট্রগুলিতে তিনি ধম্ম প্রচারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অশোকের রাজ্যশাসন নীতিতেও তাঁর ধম্মের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। তিনি দিগ্বিজয়ের নীতি ত্যাগ করে ধম্ম বিজয়ের নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
Next Post Previous Post