ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতির জনক সুকর্নোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতির জনক সুকর্নোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

জাতির জনক সুকর্নোর ভূমিকা

১৯২০ সালে সারিকাৎ ইসলাম ভেঙে গেলে সেখান থেকে কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসীরা বেরিয়ে এসে P.K.I নামে একটি কমিউনিস্ট দল গঠন করে। সারিকাৎ ইসলামের বাকি সদস্যরা আর সংগ্রাম চালাবার মতো জোট গঠন করতে না পারায় ১৯২০-২৯ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই রাজনৈতিক পটভূমিতে একটি নতুন দলের উত্থান ঘটে যা Nationalist Party of Indonesia বা P.N.I-এর, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুকর্নো। এই সংগঠনের মাধ্যমেই ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সুসংগঠিত হয়।


সুকর্নোর পরিচয়

ছাত্রজীবন থেকেই সুকর্নো স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যা 'Young Java' আন্দোলন নামেও খ্যাত। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা যেমন 'Utusan Hindia, Indonesia Muda' প্রভৃতির সাথে যুক্ত ছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় সংহতির প্রচেষ্টা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও ইসলামের সমন্বয় ঘটানো। সুকর্নো তাঁর পত্রিকায় জাতীয়তাবাদীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বিভেদ সৃষ্টিকারী সমস্ত বিষয় সরিয়ে রেখে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা লাভ করতে গেলে কেবল মস্কোর কমিনটার্ন থেকে সাহায্য নিলে হবে না, ইন্দোনেশীয় জনগণকে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ করলে তবেই স্বাধীনতা আসবে। তিনি ধর্ম বিশেষে, উল্লেখ করে বক্তৃতা দিতেন। যেমন মুসলিম প্রধান এলাকায় বক্তৃতার সময় তিনি কোরান থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, তেমনি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বক্তৃতার সময় রামায়ণ ও মহাভারত থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। তাঁর জনগণের চিত্ত জয়ের ক্ষমতা ছিল। তিনি যথেষ্ট বাগ্মী ছিলেন।


সুকর্নোর নির্বাসন

১৯২৮ সালে তিনি কারারুদ্ধ হলে তার প্রতিষ্ঠিত দল ভেঙে যায়। ১৯৩০ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং Partindo-এর সাহায্যে আবার জাতীয় দল গঠনে তৎপর হন। ৯ বছর তাকে Benclen দ্বীপে নির্বাসিত করা হয় জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের জন্য। তবে তার নির্বাসন হলেও ইন্দোনেশিয়ায় তার প্রভাব অব্যাহত ছিল। ১৯৩৩-৪১ সালের মধ্যে তিনি না থাকলেও P.P.P.K.I. নামের যে জাতীয়তাবাদী মঞ্চ তিনি গঠন করেছিলেন তার মাধ্যমেই ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিচালিত হত। কিন্তু ক্রমেই তা ভেঙে যায়। তবে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়-Gerindo, G.A.P.I, Moyhis RakjatI ndonesia প্রভৃতি বিভিন্ন নামে।


জাপানী আক্রমণ ও সুকর্নোর কর্মসূচি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন পর্বের সূত্রপাত হয়। ১৯৪২ সালে জাপান ইন্দোনেশিয়া দখল করে। জাপানের অধীনে ইন্দোনেশিয়ায় আর্থিক ও সামাজিক জীবনে একটা পরিবর্তন আসে। জাপান সরকার জাতীয়তাবাদী ইন্দোনেশীয়দের সমর্থন লাভের জন্য স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। জাপানের সাথে হাত মেলায় ডাচ শাসন বিরোধী Santri সম্প্রদায় ও গণজাতীয়তাবাদী দলগুলি। এই সংগঠনগুলির সমন্বয়ে জাপান স্থাপন করে 'গণশক্তি কেন্দ্র' বা Putea। এই সময়েই সুকর্নো মুক্তিলাভ করেন, এবং জাপানী সামরিক কর্তৃপক্ষের সমর্থনে সাংগঠনিক কাজে জড়িত হন। দেশে ফিরে তিনি বিপুল অভ্যর্থনা পান। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত তৈরি করে ইন্দোনেশিয়া রাজার স্বীকৃতি আদায় করেন।


Short Questions:

প্রশ্ন ১: সুকর্নো ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?

উত্তর: সুকর্নো ছাত্রজীবন থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি 'Young Java' আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জাতীয় সংহতির প্রচেষ্টা চালাতেন। তার লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও ইসলামের সমন্বয় ঘটানো।


প্রশ্ন ২: সুকর্নো কোন দলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

উত্তর: সুকর্নো Nationalist Party of Indonesia (P.N.I) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই দলের মাধ্যমেই ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সুসংগঠিত হয়েছিল।


প্রশ্ন ৩: সুকর্নোকে কখন এবং কেন কারারুদ্ধ করা হয়েছিল?

উত্তর: ১৯২৮ সালে সুকর্নোকে কারারুদ্ধ করা হয়। তার প্রতিষ্ঠিত দল ভেঙে যায়, কিন্তু ১৯৩০ সালে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান এবং Partindo-এর সাহায্যে আবার জাতীয় দল গঠনে তৎপর হন।


প্রশ্ন ৪: সুকর্নো কত বছর নির্বাসিত ছিলেন এবং কোথায়?

উত্তর: সুকর্নো ৯ বছর Benclen দ্বীপে নির্বাসিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের জন্য। নির্বাসনকালে তার প্রভাব ইন্দোনেশিয়ায় অব্যাহত ছিল।


প্রশ্ন ৫: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুকর্নোর ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪২ সালে জাপান ইন্দোনেশিয়া দখল করলে সুকর্নো মুক্তিলাভ করেন। জাপানী সামরিক কর্তৃপক্ষের সমর্থনে তিনি সাংগঠনিক কাজে জড়িত হন এবং ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত তৈরি করেন। 


প্রশ্ন ৬: সুকর্নো কেন এবং কীভাবে ধর্মীয় উদ্ধৃতি ব্যবহার করতেন?

উত্তর: সুকর্নো বক্তৃতার সময় মুসলিম প্রধান এলাকায় কোরান থেকে এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় রামায়ণ ও মহাভারত থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। এর মাধ্যমে তিনি জনগণের চিত্ত জয় করার চেষ্টা করতেন এবং জাতিগত ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান জানাতেন।

Previous Post