হরপ্পা সভ্যতার উৎপত্তি, অবস্থান ও আবিষ্কারক | সিন্ধু সভ্যতার মানুষের অর্থনৈতিক জীবন - Itihas Pathshala

Inquire : হরপ্পা সভ্যতার উৎপত্তি, অবস্থান?
হরপ্পা সভ্যতার উৎপত্তি অর্থনৈতিক জীবন?
হরপ্পা সভ্যতার উৎপত্তি আবিষ্কারক?
সিন্ধু সভ্যতা কী?


Discuss the origin of the Harappan civilization in the light of archeological excavations.


পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাবে সহিওয়াল জেলায় অবস্থিত হরপ্পা দীর্ঘকাল যাবৎ ইরাবতী নদীর তীরবর্তী তার বিস্তৃত এলাকার কারণে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অত্যন্ত পরিচিত ছিল। কিন্তু ১৯২২ সালে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধের লারকানা জেলায়, সিন্ধু নদের তীরভূমির নিকটে, মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করার পূর্বে মহান এবং প্রাচীন সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে হরপ্পার প্রকৃত তাৎপর্য অজ্ঞাত, অস্বীকৃত ছিল সকলের। স্যার জন মার্শাল হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোয় আবিষ্কৃত সংস্কৃতির পরিচয়ে ‘সিন্ধু সভ্যতা' নামটির ব্যবহার করেন। ‘সিন্ধু” নামের মধ্যে এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং ‘সভ্যতা' শব্দটিতে নগর অস্তিত্বের আভাস রয়েছে।

হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোর কতকগুলি মৌলিক সাংস্কৃতিক চিহ্ন রয়েছে। পরবর্তীকালে অন্যান্য যে সব লোকালয় আবিষ্কৃত হয়েছে, তারা সিন্ধু সভ্যতার অন্তর্গত কিনা, সেটি ওই চিহ্নের সংকেতে শনাক্ত করা যায়। এই চিহ্নগুলি হলো: (ক) লাল পোড়ামাটির কুম্ভকারের চাকে প্রস্তুত বিশিষ্ট মৃৎপাত্র অথবা কখনও কখনও লাল রঙের প্রলেপ দেওয়া, কয়েকটি কালো রঙ করা পাত্র; (খ) সিন্ধু লিপি; (গ) পোড়ানো ইট সেই সঙ্গে রোদে শুকনো কাদামাটির ইট; (ঘ) শহর ও শহরতলীর জনবসতিতে সোজা পথ তৈরি করার প্রবণতা; (ঙ) মৃতদেহ সমাধিস্থ করার পদ্ধতি ইত্যাদি। স্বাভাবিক ভাবেই এই বৈশিষ্ট্য প্রতিটি জনবসতিতে দেখা যাবে এমন আশা করা যায় না। বিশেষত ক্ষুদ্র জনবসতির ক্ষেত্রে কিংবা যেখানে কোনও খননকার্য হয়নি সে সব এলাকা তো নয়ই। মৃৎপাত্র এবং ইট—এ দুটিই সম্ভবত সবচেয়ে সহজলভ্য লক্ষণীয় চিহ্ন।

সিন্ধু সভ্যতার অন্তর্গত জনবসতিগুলি পাকিস্তানের সমতল ভূমিতে এবং বেলুচিস্তানে, ভারতের অন্তর্ভুক্ত পাঞ্জাব প্রদেশে, হরিয়ানায়, উত্তর-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে, উত্তর রাজস্থান এবং গুজরাটে আবিষ্কৃত হয়েছে।

ধুলো, আবর্জনা এবং ধ্বংসাবশেষের স্তূপে বাসস্থানগুলির উচ্চতাও যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই ঘটনা বিশেষ ভাবে মহেঞ্জোদারোতে চোখে পড়ে। কূপের মুখও নীচের মূল অংশ থেকে অনেকটা উঁচুতে রয়েছে। এই স্তূপ যেহেতু অনেক ধীরে ধীরে জমে সে কারণে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, সিন্ধু সভ্যতা অন্তত ৫০০ বছর টিকেছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া অসংখ্য কার্বন তারিখে এই দীর্ঘায়ুর বিষয়টি সমর্থিত হয়। প্রাচীন এবং পরিণত সিন্ধু সময়কালের মধ্যে অসংখ্য সমাপতন এবং তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই যায়। কাজেই কার্বন অস্থিগুলি যেখানে ঘন সন্নিবিষ্ট সেটিকেই সিন্ধু সভ্যতার যুগ হিসেবে মেনে নেওয়াই কাম্য। সেই সময়কালটি গড়পরতা ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ২০০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত।

বাস্তবে এত বিশাল ক্ষেত্রব্যাপী সিন্ধু সভ্যতার যুগপৎ উপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে এই সভ্যতা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে উদ্ভূত হয়নি। একটি ক্ষুদ্রতর মূল কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই মূল কেন্দ্র কোন্ এলাকায় অবস্থিত, সেটি আজও স্থির করা যায়নি, কারণ সিন্ধু সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ কোনও একটি প্রাচীন সংস্কৃতির গর্ভে আপনা আপনি উদ্ভূত হয়েছিল – খনন করা অঞ্চলগুলি থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সিন্ধু সভ্যতার মূল ক্ষেত্রটি সম্ভবত পাঞ্জাব এবং উত্তর ও মধ্য সিন্ধের কোট ভিজি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মূল উৎস যাই হোক না কেন কেবলমাত্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেই সিন্ধু সভ্যতার পরিব্যাপ্ত অঞ্চলগুলি তার বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে। মাপের একক, নগর-পরিকল্পনা, এবং লেখন পদ্ধতির মতো ক্ষেত্রগুলিতে এমন সমরূপতা কখনওই সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উদ্ভূত হতে পারে না।

যে ‘সিন্ধু সাম্রাজ্য' প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল তার সর্বত্র এই সভ্যতার অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনচর্চার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আরোপিত হয়েছিল। অবশ্য সিন্ধু সভ্যতার সমগ্র জীবনকালব্যাপী এ রকম কোনও সাম্রাজ্য তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল তা ভাবাও সঠিক নয়। এই সাম্রাজ্য কয়েকটি আঞ্চলিক রাজ্যে বিভাজিত হতে পারে এবং প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজ নিজ অঞ্চলে মূল বিজয়ী শক্তির স্থাপিত প্রতিষ্ঠান এবং রীতিরেওয়াজ পৃথক ভাবে বজায় রাখতে পারে। যাই হোক, সিন্ধু সভ্যতার প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্ভবত অনেক বেশি কঠোর এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

সঠিক ভাবে জানা যায় না যে সিন্ধু উপত্যকার ঠিক কোন্ অঞ্চলে সিন্ধু রাষ্ট্রের মূল সিংহাসনটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাস্তবে সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন উপাদান যেমন—শহর, রাষ্ট্র, সিল, লেখনরীতি, পোড়া ইট, ষাঁড়-টানা গাড়ি ইত্যাদি সিন্ধু উপত্যকায় একত্রিত হওয়ার আগেই সবকটির পূর্বসূরি ছিল মেসোপটেমিয়া। সে কারণে মেসোপটেমিয়া থেকে এ সমস্ত উপাদান এখানে এসেছিল কিনা এ প্রশ্ন প্রায়শই উঠেছে। যদিও দু'টির মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগের প্রমাণ নেই। আবশ্যিক উপাদানের বিচারে অনুমান করা যায় সিন্ধু সভ্যতার উৎসস্থলটি বহুল পরিমাণে দেশীয় ছিল। অবশ্য মেসোপটেমিয়ার পরোক্ষ প্রযুক্তিগত প্রসারণ এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করা যায় না।
Next Post Previous Post