জৈন ধর্ম ও মহাবীর - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর - ইতিহাস পাঠশালা

ভারত ইতিহাসে জৈন ধর্ম - সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর


 তীর্থঙ্কর কাদের বলা হয়?


‘তীর্থ' শব্দের অর্থ ‘পূণ্যভূমি'। তীর্থঙ্কর শব্দের অর্থ যাঁরা সাংসারিক দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ নির্মানের মাধ্যমে সন্ধান দেন। জৈন ধর্ম অনুসারে মানুষের মুক্তির জন্য চব্বিশজন তীর্থঙ্করের আবির্ভাব ঘটে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ঋষভদেব (প্রথম); পার্শ্বনাথ (তেইশতম); মহাবীর (চব্বিশতম)

পার্শ্বনাথ কে ছিলেন?


জৈনধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর হলেন পার্শ্বনাথ। খ্রীষ্ট পূর্ব অষ্টম শতকে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বারাণসীর ক্ষত্রিয় বংশের রাজা অশ্বসেনের পুত্র। ত্রিশবছর বয়সে সংসার ত্যাগ করে দীর্ঘ সত্তর বছর পর্যন্ত তিনি জৈন ধর্মমত প্রচার করতে থাকেন।

 মহাবীর কে ছিলেন?


জৈন ধর্মের চব্বিশতম তীর্থঙ্কর হলেন মহাবীর, খ্রীষ্ট পূর্ব ৫৪০ অব্দে বৈশালী নগরের কুন্দপুর গ্রামের ক্ষত্রিয় বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদিনাম হল বর্ধমান। তিনি পরম বা কৈবল্যলাভ করে মহাবীর হোন। দীর্ঘ বারো বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি সত্যজ্ঞান লাভ করে জিন বা জিতেন্দ্রিয়তে পরিণত হন।

 মহাবীরের পিতা, মাতা, স্ত্রী ও কন্যার নাম উল্লেখ কর।


  • মহাবীরের পিতার নাম—সিদ্ধার্থ
  • মাতার নাম—ত্রিশলা
  • স্ত্রীর নাম—যশোদা
  • কন্যার নাম— অনোজ্জা

কবে কোথায় মহাবীরের মৃত্যু হয়?


খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬৮ অব্দে ৭২ বছর বয়সে রাজগৃহের নিকট পাবানগরীতে মহাবীর অনশন করে দেহত্যাগ করেন।

 চতুর্যাম বলতে কি বোঝ?


জৈন ধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ প্রবর্তিত চারটি নীতি চতুর্যাম নামে পরিচিত। এগুলি হল—
  • (ক) অহিংসা ; 
  • (খ) মিথ্যা কথা না বলা; 
  • (গ) চুরি না করা; 
  • (ঘ) অপরের বস্তুর প্রতি আসক্তি না বাড়ানো।

 পঞ্চর্যাম কি? পঞ্চমহাব্রত কি?


জৈনধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ প্রবর্তিত চারটি নীতি গ্রহণ করে মহাবীর আর একটি নীতি সংযোজন করেন এগুলি পঞ্চর্যাম বা পঞ্চমহাব্রত নামে পরিচিত। এগুলি হল— 
  • (ক) অহিংসা, 
  • (খ) মিথ্যা কথা না বলা; 
  • (গ) চুরি না করা; 
  • (ঘ) অপরের বস্তুর প্রতি আসক্তি না বাড়ানো; 
  • (ঙ) ব্রহ্মচর্য।

 জৈন ধর্মের ত্রিরত্ন কী?


কর্মফলের হাত থেকে মুক্তির জন্য জৈনধর্মে তিনটি আদর্শ কথা বলা হয়েছে। যথা—
  • (ক) সংজ্ঞান; 
  • (খ) সৎবিশ্বাস; 
  • (গ) সং আচরণ 
  • এই তিনটি আদর্শ পালনে মানুষ সিদ্ধশীল হবে এবং কর্মফল এবং জন্মান্তর থেকে মুক্তি পাবে।

 জৈন ধর্মের মূল নীতিগুলি কি?


জৈন ধর্মের মূল নীতিগুলি হল—
  • (ক) জৈন ধর্মের তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ প্রবর্তিত চুতর্যাম।
  • (খ) মহাবীর প্রবর্তিত পঞ্চমহাব্রত; 
  • (গ) ত্রিরত্ন; 
  • (ঘ) কর্মফল ও জন্মান্তরবাদ; 
  • (ঙ) ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়।

 জৈন ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে লেখ।


জৈন ধর্মগ্রন্থগুলি হল—
  • (ক) জৈন শ্রমণ ভদ্রবাহু রচিত কল্পসূত্র; 
  • (খ) জৈন ধর্মশাস্ত্র বা বারটি অঙ্গে সংকলিত করা হয় যা একত্রে দ্বাদশ অঙ্গ বলা হয়; 
  • (গ) ষষ্ঠ শতকে সংকলিত হয় জৈন সিদ্ধান্ত; 
  • (ঘ) পরিশিষ্ট পার্বন প্রভৃতি।

 দ্বাদশ অঙ্গ কি?


জৈনধর্মের সূত্রগুলি প্রথমে মৌখিক ভাবে প্রচলিত ছিল। পরে এগুলি গ্রন্থাকারে লিপিবন্ধ করার জন্য পাটলিপুত্র জৈন সন্ত স্থলে ভদ্রের নেতৃত্বে একটি জৈনমহাসভা আহ্বান করেন। এখানে ভদ্রবাহু রচিত ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত কল্পসূত্র ১২টি অঙ্গে সংকলিত করা হয়। এগুলিকে দ্বাদশ অঙ্গ বলা হয়।

 দ্বাদশ উপাঙ্গ কাকে বলে ?


জৈন ধর্মের মূল নীতি গুলিকে সংকলিত করে যে দ্বাদশ অঙ্গ রচিত করা হয় তা শেতাম্বর জৈনরা মেনে নেয়নি। তারা বলভিতে পুনরায় এক জৈন মহাসভা আয়োজিত করে মূল অনুশাসনগুলির সাথে আরো বারোটি অনুশাসন যোগ করে। এই নতুন বিষয়গুলি দ্বাদশ উপাঙ্গ নামে পরিচিত।

 দিগম্বর ও শেতাম্বর কাকে বলে? 


খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে জৈনরা দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দাক্ষিণাত্যের এক দল জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে মহাবীরের অনুশাসনগুলি কঠোর ভাবে পালন করতেন এবং কোনো বস্ত্র পরিধান করতেন না। এরা দিগম্বর নামে পরিচিত। 
উত্তর ভারতেরর যেসব জৈন স্থলভদ্রের নেতৃত্বে নগ্নতা পালন করতেন না, শ্বেতবস্ত্র পরিধান করতেন তারা শেতাম্বর নামে পরিচিত। 

 মহাবীর কোথায় কৈবল্য লাভ করেছিলেন?


মহাবীর দীর্ঘ বারো বছর কঠোর তপস্যার পর ঋজুপালিকা নদীর তীরে ভুক্তিক গ্রামের শালগাছের নীচে কৈবল্য লাভ করেছিলেন।

 মোক্ষ কী?


জৈন ধর্মে আত্মার মুক্তিকে মোক্ষ বলা হয়। এই অবস্থায় আত্মা অনন্ত জ্ঞান; শক্তি ও শান্তির অধিকারী হয়।

 জৈন সিদ্ধান্ত কি? আগম কি ?


খ্রীষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে গুজরাটের বলভিতে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতিতে জ্ঞানধর্মগ্রন্থকে নতুন করে সংকলিত করা হয়। এই সংকলন জৈন সিদ্ধান্ত বা আগম নামে পরিচিত হয়। জৈন সিদ্ধান্ত আবার অঙ্গ, উপাঙ্গ, মূল সূত্র এই বার ভাগে বিভক্ত।

 জৈনধর্মের কয়েকজন দার্শনিকের নাম লেখ।


ভদ্রবাহু, স্থলবাহু, হেমচন্দ্র, হরিভদ্র, সিদ্ধসেন প্রমুক দার্শনিকের নাম উল্লেখযোগ্য। 

বহির্ভারতে জৈনধর্মের কেন প্রসার লাভ করেনি?


ভারতের বাহিরে জৈন ধর্ম প্রসারিত হয়নি। এর কারণ গুলি হল—
  • (ক) জৈনধর্মের কঠোর অনুশাসন পালন বিদেশীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
  • (খ) জৈন ধর্মে অহিংসার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদানের ফলে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে পালনীয় ছিল না।
  • (গ) জৈন ধর্ম অনুযায়ী মুনিঋষিদের সমুদ্র যাত্রা নিষিদ্ধ ছিল।

 স্তূপ কাকে বলে? 


খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বুদ্ধদেব ও বৌদ্ধধর্মের প্রধান সন্ন্যাসীদের দেহাবশেষ ও তাদের ব্যবহার্য জিনিস পত্রের উপর যে অধবৃত্তাকার গম্বুজ জাতীয় স্থাপত্য নির্মান করা হতো তাকে স্তূপ বলা হয়। এগুলি মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সাঁচীর স্তূপ, ভাহুত স্তূপ, বরো বুদুরের স্তুপ।

 চৈত্য কাকে বলে? 


ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন ও নিরিবিলি ধর্মচর্চার জন্য পাহাড় কেটে যে কৃত্রিম গুহা নির্মান করা হতো। তাকে চৈত্য বলা হতো। এর মাঝে একটি ছোট স্তূপ থাকতো এবং গুহার উপর ছাদ আর্চ আকৃতির হতো। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বারবার পর্বতের লৌমশ ঋষির গুহা, নাগার্জুন চৈত্য, কালে চৈত্য।

 বিহার কাকে বলে ?


বৌদ্ধ সাধকদের বৌদ্ধ ধর্মচর্চা ও বনবাসের জন্য নির্মিত মঠ গুলি বিহার বা সংঘ বা সংঘারাম নামে পরিচিত। বিহারের উন্মুক্ত প্রান্তে বুদ্ধমূর্তি বা স্তূপ নির্মাণ করে উপাসনা করা হতো প্রাঙ্গনকে ঘিরে সাধকদের বসবাসের জন্য ছোট ছোট ঘর থাকতো। পরবর্তীকালে বিহারগুলি বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এগুলির মধ্যে অন্যতম হল নালন্দা মহাবিহার।

 ভদ্রবাহু ও স্থূলভদ্র কে ছিলেন? 


খ্রীঃ পূঃ তৃতীয় শতকে জৈন সন্ন্যাসীরা দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দক্ষিণ ভারতের বেলগোলার এক দল জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে জৈনধর্মের অনুশাসন কাঠর গুলি রাগের ভাবে পালন করতেন এবং কোন গাছ বা বস্ত্র পড়তেন না ভদ্রবাহুর অনুগামীর পরবর্তী কালে দিগম্বর নামে পরিচিত হয়। তার রচিত গ্রন্থের নাম 'কল্পসূত্র'৷
একই সময়ে উত্তর ভারতে লভদ্রের নেতৃত্বে একদল জৈন সন্ন্যাসী জৈন ধর্মের অনুশাসন গুলি কঠোর ভাবে না মেনে শ্বেত বস্ত্র পরিধান করতেন ও মস্তকে আবরণ ব্যবহার করতেন। তাঁর অনুগামীরা পরবর্তীকালে শ্বেতাম্বর নামে পরিচিত হয়। 

 কেন মহাবীর কে জৈন ধর্মের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়?


মহাবীরের পূর্বে ২৩ জন তীর্থঙ্করে আবির্ভাব হলেও ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীরকে জৈন ধর্মের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়, তিনি জৈন ধর্মের তত্ত্ব গুলি সহজ সরল ভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। সিদ্ধি লাভের পর তিনি চম্পা, কোশল, মিথিলা, অঙ্গ সহ পূর্ব ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চলে জৈন ধর্মের প্রচার করেন। তার নেতৃত্বেই জৈন ধর্ম বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে তাই মহাবীরকে জৈন ধর্মের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।
Next Post Previous Post