প্রাচ্যবাদ সম্পর্কে ধারনা দাও৷

প্রাচ্যবাদ সম্পর্কে ধারনা দাও

ইউরোপীয়রা ওরিয়েন্ট বা প্রাচ্য বলতে প্রধানত এশিয়া মহাদেশকেই বোঝাত। প্রাচ্যের সংস্কৃতি এবং সভ্যতা তাদের বর্ণনায় খ্রিস্টান ইউরোপের থেকে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাচ্য সম্বন্ধে ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল দুই ধরনের—
  • (ক) খ্রিস্টান ইউরোপের থেকে পৃথক ইসলামিক এশিয়া অর্থাৎ অটোমান তুর্কিদের অধিকৃত অঞ্চলসমূহ৷
  • (খ) এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল যেমন মুঘল ভারতবর্ষ এবং পার্শিয়া। 

কিন্তু ইউরোপীয়রা যখন এশিয়ার অন্য অঞ্চলগুলিতে তাদের আধিপত্য স্থাপন করল তখন প্রাচ্য সম্বন্ধে তাদের ধারণায় কিছু পরিবর্তন এসেছিল এবং ভারতবর্ষ, চিন, জাপান, মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে তারা দূর প্রাচ্যের দেশ বলে চিহ্নিত করেছিল। ইউরোপীয়রা এশিয়া সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান আহরণ করেছিল বিভিন্ন উপাদান থেকে এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে যে জ্ঞানচর্চা তাকেই Orientation বা প্রাচ্য বিদ্যাচর্চা বলা হয়ে থাকে। প্রাচ্যবিদ্যার আলোচনায় সাধারণত যে বিষয়গুলিকে চর্চার জন্য বেছে নেওয়া হলো সেগুলি হলো ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি। প্রাচ্য জাগতিক জ্ঞান চর্চা করতে ইউরোপীয়রা প্রাচ্যের মানুষকেও ব্যবহার করেছে। প্রাচ্য বিদ্যাচর্চার সাধারণত দুটি দিক আছে –
  • (ক) আরবি, ফার্সি এবং তুর্কি ভাষা ও সভ্যতা নিয়ে চর্চা যেখানে ইসলামকে প্রাধান্য দেওয়া হয়; 
  • (খ) চিন এবং ভারতবর্ষের ধ্রুপদী ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়চর্চা।

এডওয়ার্ড সাইদের মতে, প্রাচ্যবাদ বলতে বোঝায় মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কারকে। মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যবাদের বিভেদ হলো প্রাচ্যবাদ। প্রাচ্যবাদ সম্পর্কে পর্যালোচনা শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের শেষ ভাগে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক এখানে নিজেদের তত্ত্ব পেশ করেন। পরবর্তীকালে এডওয়ার্ড সাইদ, বার্নার্ড কোহেন, রনাল্ড ইন্ডেন, আশিস নন্দী প্রমুখ এই আলোচনাকে চিত্তাকর্ষক করে তোলেন। এই পর্যালোচনা মূলত এশিয়া ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে যে পার্থক্য তার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে এশিয়া বলতে তাঁরা বোঝাচ্ছেন অন্য সত্তা এবং পাশ্চাত্য হলো নিজ সত্তা। এই দুটির যে ভিন্নতা তারই ভিত্তিতে প্রাচ্যবাদকে বুঝতে হবে।

Related Posts
প্রাচ্য বিদ্যাচর্চার কালে প্রাচ্য সম্বন্ধে যে জ্ঞান সৃষ্টি হয়েছে সেই Oriental discourse-কে সাম্প্রতিককালে সমালোচনা করা হয়েছে। ইউরোপীয় অভিজ্ঞতায় প্রাচ্য সম্বন্ধে যে জ্ঞান সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু করেছেন। এডওয়ার্ড সাইদ। অষ্টাদশ শতকের ঔপনিবেশিকতার ক্ষেত্রে সাইদ প্রধানত তিনটি পরস্পর নির্ভরশীল ধারণার আলোচনা করেছেন—প্রাচ্যকে অধ্যয়ন করা এবং প্রাচ্য সম্বন্ধে জ্ঞানের উৎপাদন, পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যের মধ্যেকার পার্থক্যকে আলোকপাত করা যেখান থেকে Orientalism-এর তত্ত্বের শুরু এবং Orientalism এর discourse এর দ্বারা প্রাচ্যবিদ্যার পণ্ডিতরা, তত্ত্ববিদ্রা এবং ঔপনিবেশিক শাসকবর্গ তাদের বৌদ্ধিক এবং প্রশাসনিক কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে এই তিনটি অর্থকেই প্রকাশ করেছেন। Orientalism-এর তত্ত্বের সাহায্যে স্বৈরতান্ত্রিক যুক্তিহীন প্রাচ্যের উপর যুক্তিবাদী জ্ঞানোদীপ্ত পাশ্চাত্যের আধিপত্য স্থাপনকে বৈধ এবং যুক্তিযুক্ত করা হয়েছে। ক্ষমতা এবং আধিপত্যের প্রসঙ্গে ইউরোপীয় identity-কে Oriental identity-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর মনে করা হয়েছে এবং এই আধিপত্য প্রাচ্যের মানুষদের নিজেদের সম্বন্ধে ধ্যানধারণাকেও প্রভাবিত করেছে। কার্জন ১৯১৪ সালে ঘোষণা করেছিলেন যে School of Oriental Studies প্রতিষ্ঠার পিছনে সামাজিক স্বার্থ ছিল সুতরাং Orientalism এবং সাম্রাজ্যবাদকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়।

রোনাল্ড ইন্ডেন ভারতচর্চার ক্ষেত্রে Orientalism নিয়ে আলোচনা করেছেন Modern Asian Studies এর একটি প্রবন্ধে এবং তার গ্রন্থ Imagining India-তে ইন্ডেন বলেছেন যে ভারতচর্চা সংক্রান্ত বিতর্ককে ধরে নেওয়া হয় যে ভারতের সভ্যতা এবং সংস্কৃতি পশ্চিমের সম্পূর্ণ বিপরীত। ইন্ডেনের মতে, Orientalist discourse হিন্দুধর্ম এবং জাতের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। হেগেল এবং জেমস মিল-এর রচনা বিশেষভাবে ভারত সংক্রান্ত বিতর্ককে প্রভাবিত করেছে৷
Next Post Previous Post