অর্থশাস্ত্রে কৌটিল্য বর্ণিত রাষ্ট্রতত্ত্ব বা ‘সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব' আলোচনা করো। এই তত্ত্বের গুরুত্ব লেখো।


কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে ‘প্রকৃতি সম্পদ’ নামে প্রকরণে রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গ বা উপাদানের উল্লেখ করেছেন । এই সাতটি অঙ্গ হল—স্বামী, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোশ, দণ্ড এবং মিত্র। এই সাতটি অঙ্গকে তিনি রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ বলে উল্লেখ করেছেন।
সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের পরিচয়
কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র
সপ্তাঙ্গের অর্থ সাতটি অঙ্গ
১ম স্বামী
২য় অমাত্য
৩য় জনপদ
৪র্থ দূর্গ
৫ম কোষ
৬ষ্ঠ দন্ড
৭ম মিত্র

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের পরিচয়


কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রের বর্ণনায় ‘সপ্তাঙ্গিক রাজ্যম’—শব্দ দুটির উল্লেখ রয়েছে। সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব অনুযায়ী রাজ্য বা রাষ্ট্র সর্বসমেত ৭টি অঙ্গ বা উপাঙ্গ নিয়ে গঠিত।

প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র এবং পুরাণগুলিতে রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ মতবাদ বা ধারণার উন্মেষ ঘটেছিল। প্রাচীন মুনি ঋষিগণ রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ মতবাদকে স্বীকৃতি ও সমর্থন জানিয়েছিলেন। মনুসংহিতা (নবম অধ্যায়), বিয়ুস্মৃতি (৩য় অধ্যায়), যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি (১ম অধ্যায়), অগ্নিপুরাণ (২১৮ অধ্যায়), মৎসপুরাণ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে রাষ্ট্র সপ্ত অঙ্গের সমবায়ে গঠিত।

১. স্বামী 👉

কৌটিল্য, স্বামী বলতে রাজা অর্থাৎ রাজ্যের প্রধানকেই বুঝিয়েছেন। এই স্বামী অর্থাৎ রাজার কর্তব্যের উল্লেখে তিনি রাজার চারটি গুণাবলির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন যথা—
  • অভিগামিক গুণ : সত্যনিষ্ঠা, ধর্মপরায়ণ, বিনয়, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি হল অভিগামিক গুণ। অর্থশাস্ত্রের মণ্ডলযোনি-ষষ্ঠ অধিকরণ'-এর প্রথম অধ্যায়ে কোটিল্য রাজার ১৬টি অভিগামিক গুণের উল্লেখ করেছেন। 
  • প্রজ্ঞাপন : দ্রুত কোনো সমস্যা সঠিকভাবে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা, সঠিক কাজ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হল প্রজ্ঞাপন। ও উৎসাহ গুণ: সাহস এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার ক্ষমতা হল এই গুণের লক্ষণ । 
  • আত্ম সম্পদ : বাগ্মিতা, ইন্দ্রিয় সংযম, স্মৃতিশক্তি, বিপদকালে অবিচলিত থাকা এই সমস্ত গুণ হল আত্ম সম্পদ।

 ২. অমাত্য বা মন্ত্রী 👉

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে ‘অধ্যক্ষ প্রচার’ নামে অধ্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অমাত্য এবং তাদের নিয়োগ পদ্ধতি, দায়িত্ব ও কর্তব্য আলোচনা করেছেন। পরিচিতি: কৌটিল্য বলেছেন, রাজাকে রাজকার্য পরিচালনায় সাহায্য করবেন বেশ কয়েকজন কর্মচারী বা অমাত্য। অর্থশাস্ত্র অনুসারে এরকম কয়েকজন কর্মচারী হলেন—পুরোহিত, সমাহর্তা, সন্নিধাতা, কোশাধ্যক্ষ, রাজদূত, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারক প্রমুখ। ও দায়িত্ব ও কর্তব্য: অমাত্যের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হল কোনো কাজ শুরু করার আগে তার নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা। এক্ষেত্রে কৌটিল পাঁচটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দানের উল্লেখ করেছেন, যথা— 
  • (i) উপায় বা পদ্ধতি নির্ণয়, 
  • (ii) দক্ষ কর্মচারী নিয়োগ, 
  • (iii) দ্রব্য সম্পদ বিষয়ক নীতি নির্ধারণ, 
  • (iv) কাজের সমস্যা হলে তার সমাধানের চিন্তা
  • (v) কাজের ফলাফল সম্পর্কে ধারণা করা। 
অমাত্য প্রসঙ্গে কৌটিল্য বলেছেন— “অমাত্য অবশ্যই দেশীয় হবেন এবং স্বামী (প্রভু)-র প্রতি গভীর অনুরক্ত থাকবেন।”

৩. জনপদ 👉

কৌটিল্য ‘অধ্যক্ষ প্রচার’ অধ্যায়ের দ্বিতীয় অধিকরণে জনপদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। জনপদ বলতে কৌটিল্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও তার অধিবাসীদের বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন জনবিহীন জনপদ অর্থহীন। তিনি আদর্শ ভূখণ্ড বলতে উর্বরভূমি, প্রচুর অরণ্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ বিশিষ্ট অঞ্চল এবং উৎকৃষ্ট মানের গোচারণভূমিকে বুঝিয়েছেন। ও আয়তন ও জনসংখ্যা: জনপদের আয়তন ও জনসংখ্যা প্রসঙ্গে কৌটিল্যের ধারণায় গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টলের মতের প্রতিফলন মেলে। কৌটিল্য বলেছেন, প্রতিটি গ্রামে কমপক্ষে একশত এবং সর্বাধিক পাঁচশত পরিবার বসবাস করবে।

৪. দূর্গ 👉

‘দুর্গনিবেশ' নামে অধ্যায়ে কৌটিল্য দুর্গ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কৌটিল্যের মতে দুর্গগুলি সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রের তৃতীয় অধ্যায়ে 'দুর্গবিধানম' অর্থাৎ দুর্গ নির্মাণ সম্বন্ধে তাঁর ধারণা ব্যক্ত করেছেন। আর চতুর্থ অধ্যায়ে দুর্গনিবেশ' অর্থাৎ দুর্গের অভ্যন্তরীণ বাস্তুবিভাগ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন ভাগ: কৌটিল্য চার ধরনের দুর্গের কথা বলেছেন। এগুলি হল – 
  • (i) জলদুর্গ : চারিদিকে জলবেষ্টিত এলাকা নিয়ে গঠিত দুর্গ হল জলদুর্গ । 
  • (ii) গৃহা বা পার্বত্য দুর্গ : চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা বা পাহাড়ের মধ্যে তৈরি হয়—এই ধরনের দুর্গ। 
  • (iii) মরুদুর্গ : মরুপ্রান্তর সংলগ্ন দুর্গগুলির নাম ছিল মরুদুর্গ। 
  • (iv) বনদুর্গ: বনাঞ্চলে প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে স্থাপিত দুর্গের নাম ছিল বনদুর্গ।

৫. কোশ 👉

কৌটিল্যের মতে রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে কোশ বা রাজার আর্থিক ক্ষমতার উপর। কৌটিল্যের মতে, কোশ হল এমন এক অর্থভাণ্ডার যা রাজা রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে উপার্জন করেন অথবা অন্য কোনো সৎ উপায়ে সংগ্রহ করেন। রাজস্বের অর্থের কয়েকটি উৎস হল প্রজাদের উপর আরোপিত ভূমিরাজস্ব, চাষিদের থেকে সংগৃহীত শস্যকর, সেচকর ব্যাবসাদারদের থেকে আদায়িকৃত পণ্যকর প্রভৃতি।

৬. দণ্ড 👉

কৌটিল্যের মতে দণ্ড বা বল অর্থাৎ সেনাবাহিনীর উপর রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। কৌটিল্যের মতে শূদ্র ও বৈশ্যদেরও সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাঁর ধারণায় সেনারা রাজার ইচ্ছায় পরিচালিত হবে এবং রাজার নির্দেশ মতো কাজ করবে। দণ্ড বা বল শব্দ দ্বারা মূলত হস্তী, অশ্ব, রথ এবং পদাতিক এই চতুরঙ্গ সেনাদের কথা বলা হয়েছে। পদাতিক সেনাদেরও ছয়টি বিভাগ রয়েছে— 
  1. মৌলবল
  2. ভূতকবল
  3. শ্রেণিবল
  4. মিত্রবল
  5. অমিত্রবল
  6. অটবিরল।

৭. মিত্র 👉

সপ্তাঙ্গর শেষ উপাদানটি হল মিত্র বা সুহৃদ। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে মিত্র ব্যক্তি বা মিত্র রাষ্ট্রের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। কৌটিল্যের ধারণায়, মিত্র হল সে-ই, যার কাছ থেকে বিপদের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। আর-এক দিক থেকে মিত্র বা সুহৃদ শব্দটি বিজিগীষু (জয় করতে ইচ্ছুক) রাজাদের সঙ্গে মিত্রতা সূত্রে আবদ্ধকারীদের বোঝানো হয়েছে। প্রকারভেদঃ কৌটিল্য দু-ধরনের মিত্রের কথা বলেছেন—
  • (i) সহজ (sahaja) : পিতামহ ও পিতার সময়কাল থেকে যে ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে তারা হল সহজমিত্র। 
  • (ii) ক্রিটিমা (Kritrima) : এই ধরনের মিত্র হল অর্জিত মিত্র। এই ধরনের মিত্রতা স্বাস্থ্য, সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা দেয়। কৌটিল্যের মতে— সহজমিত্রতা ক্রিটিমার চেয়ে উৎকৃষ্ট বা শ্রেষ্ঠ। 

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের গুরুত্ব

প্রথমত: রাষ্ট্রের প্রকৃতি বিষয়ক কৌটিল্যের 'সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব' ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তায় নতুন রাষ্ট্রাদর্শের জন্ম দিয়েছে৷

দ্বিতীয়ত: সনাতনী কৌটিল্য এই তত্ত্বে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ বা উপাদানের আপেক্ষিক (ব্যসন) আলোচনা করেছেন। 

তৃতীয়ত : এই তত্ত্বে কৌটিল রাষ্ট্রের পক্ষে হিতকর কিছু গুণাবলির উল্লেখ করেছেন, যেগুলি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে কার্যকর। 

চতুর্থত: কৌটিল্য বর্ণিত রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের প্রতিটি উপাদান একে অপরের উপর নির্ভরশীল এবং পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত।
Next Post Previous Post