১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর


ভারতীয়দের বহু দিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহতে, যা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা দেখাবার চেষ্টা করেন যে এই বিদ্রোহ কেবল সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সাধারণ মানুষ ব্যাপক ভাবে এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেননি। কোনও কোনও ভারতীয় ঐতিহাসিকও এই ধারণায় বিশ্বাসী, কেউ কেউ আবার একে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের সংগ্রাম বলেছেন। কিছু ভারতীয় জাতীয়তাবাদী লেখকগণ এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেছেন।

ভারতীয়দের বহু দিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহতে, যা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা দেখাবার চেষ্টা করেন যে এই বিদ্রোহ কেবল সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সাধারণ মানুষ ব্যাপক ভাবে এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেননি। কোনও কোনও ভারতীয় ঐতিহাসিকও এই ধারণায় বিশ্বাসী, কেউ কেউ আবার একে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের সংগ্রাম বলেছেন। কিছু ভারতীয় জাতীয়তাবাদী লেখকগণ এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেছেন।

ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের চরিত্রকে ছোটো করে দেখবার চেষ্টা করলেও, প্রথম যুগের জাতীয়তাবাদী লেখকরা এই বিদ্রোহকে গণবিদ্রোহ ও এর নেতাদের স্বাধীন ভারত গঠনের ... প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নায়ক বলে অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। তিনি তাঁর বই The Indian War of Independance-এ ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে পরিকল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রাম বলেছেন। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবাসী মহাবিদ্রোহের শতবর্ষপূর্তি করেন এমন ভাবে যেন এটি ছিল প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। তবে বর্তমানে দুজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিক আর. সি. মজুমদার ও এস. এন. সেন বিস্তৃত গবেষণা দ্বারা এক মত হয়েছেন যে ১৮৫৭-র বিদ্রোহ পরিকল্পিত ছিল না। মুনশি আজিম উল্লা খান ও রঙ্গো বাপুজি বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন বলে যে ধারণা আছে তা অযৌক্তিক। মজুমদার ও সেন উভয়েই এ বিষয়ে একমত যে উনিশ শতকের মধ্য ভাগে ভারতের জাতীয়তাবাদ ছিল ভ্রূণ অবস্থায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের অধিবাসীরা মনে করত না যে তারা একই দেশের অধিবাসী। বাহাদুর শাহও সে সময় সারা দেশের শাসক ছিলেন না, অন্যদিকে নানাসাহেবও তাঁর ভাতা বন্ধ হওয়ার পরই বিদ্রোহের নেতারাও পরস্পরের ওপর ঈর্ষান্বিত ছিলেন। দেশের জনগণও বেশির ভাগই ছিল বিদ্রোহ সম্বন্ধে উদাস ও নিরপেক্ষ। আর. সি. মজুমদার ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, এটি স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল না। তিনি বলেছেন যে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের বিভিন্ন দিক ছিল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকা নিয়েছিল সিপাহিরা। এই সিপাহিদের কোনও রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না, তারা চেয়েছিল বস্তুগত লাভ। রায়বেরিলি, দিল্লি, এলাহাবাদের সৈন্যরা লুঠপাট চালিয়েছিল এবং ভারতীয় ও ইউরোপীয় উভয়েই তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। এই সৈন্যরা সাধারণ জনতার মনে ভ্রাতৃত্ববোধের অপেক্ষা ভীতির সন্ত্রাসের আশঙ্কা সৃষ্টি করে। মজুমদার সবশেষে বলেছেন যে সৈন্যরা দেশকে ভালোবেসে, মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল এরকম ধারণা সিপাহিদের আচরণের মধ্যে ফুটে ওঠেনি। তিনি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের জাতীয় গুরুত্বকে অপ্রত্যক্ষ ও পশ্চাদপদ বলেছেন।

এস. এন. সেন মনে করেন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের উত্থান হলো স্বাধীনতা সংগ্রাম। তিনি বলেছেন প্রতিটি বিপ্লবেই দেখা যায় স্বল্প সংখ্যক লোক বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে। জনসাধারণের সহানুভূতি ছাড়াই। যখন কোনও বিপ্লব সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের সমর্থন লাভ করে তখনই তা জাতীয় চরিত্র পায়। দুর্ভাগ্যবশত ভারতে ১৮৫৭-র বিপ্লবের প্রতি বেশির ভাগ জনগণই ছিল নিরুৎসাহী ও উদাসীন। তাই এই বিপ্লব জাতীয় চরিত্র লাভ করেনি। তবে এই বিপ্লবকে কেবল সামরিক উত্থান বলা যায় না বলে সেন মনে করেন। এই বিপ্লব ধর্মীয় কারণে শুরু হলেও শেষ হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসাবে। কোনও সন্দেহ নেই যে সিপাহিরা বিদেশি সরকারের পতন ঘটিয়ে দিল্লির সম্রাটের পুরোনো শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল।

আরেকজন বিশেষজ্ঞ এস. বি. চৌধুরি মনে করেন যে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ সৈন্য ও সাধারণ মানুষের নিজেদের পৃথক দাবি থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। মার্কসীয় মতানুসারে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ছিল কৃষক সেনার যৌথ বিদ্রোহ বিদেশি তথা সামন্ততান্ত্রিক অধীনতা থেকে মুক্তির জন্য, যা সামন্ততান্ত্রিক বিশ্বাসঘাতকতায় ব্যর্থ হয়।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জওহরলাল নেহরু বলেছেন মহাবিদ্রোহ ছিল সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ। আর. সি. মজুমদারের মতে, বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীরা বেশির ভাগই বস্তুগত লাভের জন্য লড়াই করেছিল এবং খুব কম লোকই দেশপ্রেম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তাই তিনি বলেছেন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ কোনও ভাবেই স্বাধীনতার জন্য প্রথম জাতীয় সংগ্রাম ছিল না। বিদেশি ঐতিহাসিকরা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে মূলত সিপাহি বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন। অধুনা জুডিথ ব্রাউন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ব্যাপারে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের পক্ষপাতপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্বীকার করেছেন। আমেরিকান ঐতিহাসিক এফ. জি. হাচিনস বলেছেন যে যদিও ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা একে কেবল সিপাহি বিদ্রোহ বলেছেন কিন্তু এই বিদ্রোহ প্রথমে সিপাহি বিদ্রোহ হিসাবে শুরু হলেও খুব শীঘ্রই এই বিদ্রোহ জনগণের বিদ্রোহে পরিণত হয়। স্ট্যানলি ওয়ালপার্ট বলেছেন, এই বিদ্রোহ সাধারণ সিপাহি বিদ্রোহের অনেক বেশি হলেও প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক কম ছিল। বিদ্রোহের প্রকৃতি যাই হোক তা শীঘ্রই ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে। পরবর্তী কালে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ১৮৫৭-র বীরত্বপূর্ণ ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা পেত। নিঃসন্দেহে ১৮৫৭-এর বিদ্রোহ ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়।
Next Post Previous Post