গুপ্তযুগের গিল্ড ব্যবস্থা ও বৈশিষ্ট্য লেখ | আদি মধ্যযুগের গিল্ডের নিয়োম কানুন, কার্যাবলী আলোচনা কর

গুপ্ত যুগের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার অন্যতম অঙ্গ ছিল গিল্ড ব্যবস্থা ৷ এই গিল্ড গুলি ছিল আধুনিক যুগের 'Chamber of Commerce' -এর মত একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ৷ গুপ্ত যুগে কারিগর বা বণিক শ্রেণি বহিরাগত সমস্যা থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে এবং নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বার্থ বজায় রাখতে যে সংস্থা গুলি গড়ে তুলেছিল তা গিল্ড বা নিগম নামে পরিচিত ছিল৷ প্রথম কুমার গুপ্তের মান্দাসোর শিলালেখ এবং স্কন্দগুপ্তের ইন্দোর তাম্রশাসন থেকে গুপ্ত যুগের গিল্ড ব্যবস্থা সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়৷ এই গিল্ড গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিল্পপতিদের সঙ্ঘ, বণিকদের সঙ্ঘ, কারিগরদের সঙ্ঘ ইত্যাদি ৷

গিল্ডের গঠন প্রণালী

প্রধানত নারদ স্মৃতি ও বৃহস্পতি স্মৃতি থেকে গিল্ডের গঠন প্রণালি ও গিল্ডের সংবিধান সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যায়৷ অর থেকে জানা যায় যে প্রতি গিল্ডে একজন সর্বোচ্চ প্রধান ছিলেন৷ যাকে বলা হত জ্যেষ্ঠক বা শ্রেষ্ঠিন৷ শ্রেষ্ঠিনদের দুটি ভাগ ছিল-
  • i. মহাশ্রেষ্ঠিন
  • ii. অনুশ্রেষ্ঠিন
তবে তাদের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল না৷ যখন দুই বা ততধিক গিল্ড যুক্ত হত, তখন তার প্রধানকে বলা হত ভান্ডাগারিক৷ এছাড়াও থাকত একটি কার্য নিয়ন্ত্রণ পরিষদ৷ এবং এই পরিষদের সদস্যরা হতেন সৎ ও ধার্মিক৷

গিল্ডের নিয়ম কানুন

গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলি বিভিন্ন নিয়োম কানুন দ্বারা পরিচালিত হত৷ -
  • ১. নারদ স্মৃতি থেকে জানা যায় যে, কয়েকটি গিল্ডের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ বৃহত্তর সংস্থা গিল্ডের বিধান ও নিয়োম কানুন তৈরি করত৷ এই আইনের প্রধান রক্ষক ছিলেন ভান্ডাগারিক৷
  • ২. গিল্ডের নিয়োম কানুনকে সঠিক ভাবে বজায় রাখা, যে কোন বিপদ থেকে গিল্ডকে রক্ষা করা ও ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করার জন্য গিল্ডে নানা চুক্তি পত্র থাকত৷ কাত্যায়ন স্মৃতি অনুসারে, প্রতিটি সদস্যকে এই চুক্তি পত্র মেনে চলতে হত৷
  • ৩. গিল্ড গুলি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সুবিধা অনুযায়ী দাম ঠিক করত৷
  • ৪. গিল্ডের সদস্যদের পারিবারিক জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে গিল্ড হস্তক্ষেপ করত৷ যেমন কোনো মহিলা সন্ন্যাসিনী হতে চাইলে তাকে কেবল স্বামীর অনুমতি নিলেই হত না, গিল্ডেরও অনুমতি নিতে হত৷

গিল্ডের কার্যাবলী

মান্দাসোর লেখ থেকে জানা যায় গিল্ডের বহুমুখী কার্যাবলী সম্পর্কে-
  • প্রথমত: বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক কাজ৷ যেমন- মন্দির প্রতিষ্ঠা, সভাগৃহ নির্মাণ, পুকুর খনন, উদ্যান নির্মাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গিল্ড গুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত৷
  • দ্বিতীয়ত: প্রতিটি গিল্ড নিজ নিজ অঞ্চলে চুরি, ডাকাতি প্রভৃতি বিপদ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করত৷ এই জন্য প্রতিটি গিল্ডে নিজেস্ব সেনাবাহিনী ছিল৷ যাকে বলা হত শ্রেণীবল৷
  • তৃতীয়ত: গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলি নিজ নিজ এলাকার বিচারকার্য পরিচালনা করত৷ এর জন্য তারা পৃথক সভা গৃহ নির্মাণ করত৷
  • চতুর্থত: গুপ্ত যুগে গিল্ড গুলি ব্যাঙ্কের মত কাজ করত৷ গিল্ড গুলি সাধারণ মানুষের আমানত গচ্ছিত রেখে তাদেরকে ঋণ দিত৷ নিগমের হাতে মন্দিরের সম্পত্তি জমানত রাখার উল্লেখ পাওয়া যায় স্কন্দগুপ্তের ইন্দোর তাম্রশাসন থেকে৷
  • পঞ্চমত: গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলি প্রয়োজনে রাজাকে পরামর্শ দান করত৷ এক্ষেত্রে গিল্ড গুলি যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করত৷



ঐতিহাসিক ডি ডি কোশাম্বি গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলিকে তেমন গুরুত্ব দেন নি৷ তার মতে, রোমান সভ্যতার সঙ্গে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের অবসান ঘটায় এবং আঞ্চলিক ভিত্তিক বানিজ্যের উৎপত্তি হয়৷ তাই স্বাভাবিক কারনেই গিল্ড গুলি দুর্বল ও গুরুত্বহীন হয়ে পরে৷ কিন্তু রমেশ চন্দ্র মজুমদার গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন৷ তার মতে গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক দিক থেকে রাজা এবং জনগনকে সাহায্য করত, অন্যদিকে তেমন বিভিন্ন জনকল্যাণ কাজে যুক্ত থাকত৷ তাই গুপ্ত যুগের গিল্ড গুলির গুরুত্বকে কখনই অস্বীকার করা যায় না৷
Next Post Previous Post