ইতিহাস কী? ইতিহাসের সংজ্ঞা বিষয়ক বিভিন্ন মতামতের উপর আলোকপাত করো।

ইতিহাস কী? ইতিহাসের সংজ্ঞা বিষয়ক বিভিন্ন মতামতের উপর আলোকপাত করো।

ইতিহাসের ধারণা

▶ উৎস

ইংরেজি History শব্দটি গ্রিক Historia ও লাতিন Histor শব্দ থেকে এসেছে। ইংরেজি History শব্দের পরিভাষা হিসেবে বাংলা ভাষায় ইতিহাস শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আবার বাংলা ইতিহাস শব্দটি সংস্কৃত ইতিহাস (ইতিহ + আস) শব্দ থেকে উদ্ভূত।

▶ অর্থ

গ্রিক Historia শব্দের অর্থ অনুসন্ধান করা। লাতিন Histor শব্দের অর্থ জ্ঞান। এই দুই শব্দের ব্যুৎপত্তিগত বিচারে History শব্দের আক্ষরিক অর্থ অনুসন্ধানের দ্বারা লব্ধ জ্ঞানকে বোঝায়। সংস্কৃত ইতিহাস শব্দের অর্থ হল অতীত ঘটনা। এই অতীত কিছুদিন আগের বা বহুদিন আগের হতে পারে। তবে অতীতের সমস্ত নয়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলিই কেবলমাত্র ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হয়। History শব্দটির আরও কয়েকটি অর্থ হল— অনুসন্ধান, গবেষণা, আবিষ্কার বা সংবাদ।

ইতিহাসের সংজ্ঞা বিষয়ক বিভিন্ন মত


যুগে যুগে ইতিহাসের সংজ্ঞা পালটেছে। ইতিহাসের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বিভিন্ন মত রয়েছে।

▶ বিদেশি মত

  • ই. এইচ. কার : এডওয়ার্ড হ্যালেট কার ইতিহাসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন,
    “ইতিহাস হল অতীত ও বর্তমানের মধ্যে অন্তহীন কথোপকথন।”
  • মার্ক ব্লখ : ঐতিহাসিক পর মার্ক ব্লখের ধারণায়, কালের সীমারেখায় আবদ্ধ মানুষ হল ইতিহাস।
  • ডাইওনিসিয়াস : গ্রিক দার্শনিক ডাইওনিসিয়াস বলেছেন, ইতিহাস হল অনুসন্ধান, গভীরভাবে কোনো কিছুর অন্বেষণ।
  • আর. জি. কলিংউড : আর. জি. কলিংউড মনে করেন যে, ঐতিহাসিকের মস্তিষ্ক থেকে অতীতের যে ছবি বেরিয়ে আসে তা হল ইতিহাস।
  • জে. বি. বিউরি : বিউরির মতে, ইতিহাস প্রকৃত অর্থেই বিজ্ঞান, তার বেশি বা কম নয়।
  • হেনরি পিরেন : হেনরি পিরেন বলেছেন,
    “আমি পুরাতত্ত্ববিদ নই, পুরাতাত্ত্বিক উপাদান খুঁজে বেড়াই না। আমি ঐতিহাসিক, জীবনের সন্ধান করি, জীবনকে ভালোবাসি।”
    — এই বিচারে ইতিহাস হল মানুষের কথা, জীবনের কথা ।

▶ ভারতীয় ধারণায়

  1. মহাভারতে : ভারতীয়দের মহাকাব্য মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে—
    “ধর্মার্থ-কাম-মোক্ষণামুপদেশঃ সমন্বিতম্। পূর্ববৃহৎ কথামুক্ত মিহিতহাসঃ প্রচক্ষতে।”
    অর্থাৎ অতীতের যেসমস্ত ঘটনার মধ্যে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের মাধ্যমে জীবনের পূর্ণতাপ্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় পথনির্দেশ পাওয়া যায়, সেই সমস্ত ঘটনাই ইতিহাস হিসেবে পরিচিত হয়।
  2. পুরাণে : প্রাচীন ভারতকে জানতে গেলে পুরাণ পাঠ প্রয়োজন। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির মূল উৎস হল পুরাণে। ইতিহাস সম্পর্কে পুরাণের বক্তব্য হল—ইতিহাস হল এমন এক জ্ঞান, যা প্রদীপের মতো মোহের অন্ধকার দূর করে মানুষের মনোজগতকে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত করে।
  3. বৈদিক সাহিত্যে : বৈদিক সাহিত্যে ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণের নিবিড় সম্পর্কের কথা বোঝাতে তাকে ‘ইতিহাস-পুরাণ” রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ 'ইতিহাস-পুরাণ' প্রাচীন গাথা, কাহিনি, উপকথা, উপাখ্যান প্রভৃতিকে নির্দেশ করে। যাস্কের নিরুক্তিতে ‘দেবাপী ও শান্তনু', ‘বিশ্বকৰ্মন ভৌবন' প্রভৃতি কাহিনিকে ইতিহাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
Next Post Previous Post